মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
এবার দুই মাস আগেই বই ছাপা শেষ করার উদ্যোগ
নূরুজ্জামান মামুন
Published : Wednesday, 14 February, 2018 at 10:24 PM

নতুন পাঠ্যবইয়ের ঘ্রাণ না ফুরাতেই আরেক কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে সরকার। নির্বাচনী বছর হওয়ায় কোনো প্রকার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। দুই মাস আগেই আগামী শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছেপে উপজেলায় পৌঁছানোর টার্গেট নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বই ছাপার সময়াবদ্ধ বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা (এটিপিপি) অনুমোদন দিয়েছে। তবে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বর্তমান চেয়ারম্যানের খামখেয়ালিতে সরকারের এ উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন মুদ্রণশিল্প (প্রেস) মালিক  সমিতির নেতারা। 

এদিকে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপা নিয়ে প্রতি বছর দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক নানা শর্তজুড়ে দেয়। সংস্থাটির কারণে বই ছাপা নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। এসব ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে সরকার এবার শতভাগ নিজস্ব টাকায় বই ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

বই ছাপার প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবি চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্বে থাকা ড. মিয়া ইনামুল হক রতন সিদ্দিকী আজকালের খবরকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এটিপিপি অনুমোদন দিয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষক সহায়িকা ছাপানোর টেন্ডার আহ্বান করেছি। চলতি মাসের মধ্যে পাঠ্যবই ছাপার টেন্ডার আহ্বান করা হবে। আগামী মাসে দরপত্র মূল্যায়ন শেষ করে কার্যাদেশ দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনী বছর হওয়ায় ৩০ অক্টোবরের মধ্যে সব বই উৎপাদন করে উপজেলায় পৌঁছে দেব।’
 
এনসিটিবি সূত্র জানায়, মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার এটিপিপি গত ২৩ জানুয়ারি অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর গত রবিবার প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার এটিপিপি অনুমোদন দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকের বই ছাপার টেন্ডার আহ্বান করা হবে আগামী ৫ মার্চ। টেন্ডারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের সঙ্গে ৬ জুন চুক্তি করা হবে। সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী (পিপিআর) ঠিকাদারদের ৪৯ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৯ আগস্টের মধ্যে অর্ধেক বই সরবরাহ করতে হবে। বাকি বই ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরবরাহ করতে হবে। 

সূত্র আরও জানায়, মাধ্যমিক স্তরের (বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন) কাগজ ও আটবোর্ডসহ বই ছাপার টেন্ডার আহ্বান করা হবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি। বই ছাপার কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি হবে ১ জুলাই। ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ করতে হবে। কাগজসহ মাধ্যমিকস্তুরের বই ছাপার (এসএসসি ভোকেশনাল, দাখিল ও আলিম ভোকেশনাল) টেন্ডার আহ্বান করা হবে ২৭ মার্চ। ঠিকাদারদের সঙ্গে বই ছাপার চুক্তি করা হবে ১১ জুলাই। ১৭ অক্টোবরের মধ্যে বই সরবরাহের সময় বেঁধে দেওয়া হবে। কাগজ ছাড়া (এসএসসি ভোকেশনাল, দাখিল ও আলিম ভোকেশনাল) বই ছাপার টেন্ডার আহ্বান করা হবে ২ মার্চ। 

ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি হবে ১৫ জুন। ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহ করতে হবে। ব্রেইল, প্রাক-প্রাথমিক ও মাধ্যমিকস্তরের বই ছাপার টেন্ডার আহ্বান করা হবে ২০ এপ্রিল। কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি হবে ৮ আগস্ট। ২৮ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপিয়ে  জেলা-উপজেলায় পৌঁছে দিতে হবে। তবে এ তারিখ এগিয়ে আনার চিন্তা করছে এনসিটিবি। 

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী বছর হওয়ায় বছরের শেষ দিকে আন্দোলন করতে পারে বিএনপি। ওই সময় দেশে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বই ছাপিয়ে জেলা-উপজেলায় পৌঁছানো কঠিন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হতে পারে। সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে। প্রতি বছর বছররের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার সরকারের বড় সাফল্য মøান হতে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই দুই মাস আগে বই উপজেলা পর্যায়ের সরকারি গুদামে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. ফরহাদ হোসেন আজকালের খবরকে বলেন, ‘মাধ্যমিকস্তরের বইয়ের চাহিদা চেয়ে মাউশিকে (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফরত) চিঠি দেওয়া হয়েছ। ১৫ ফেব্রæয়ারির (আজ বৃহস্পতিবার) মধ্যে চাহিদা পাঠাতে বলা হয়েছে। অন্ধদের ব্রেইল বইয়ের চাহিদা চেয়ে সমাজসেবা অধিদফতরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ চাহিদা বেশি নির্ধারণ করে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।’ 

এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. আব্দুল মজিদ আজকালের খবরকে বলেন, ‘এবার ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হবে। প্রাথমিকস্তরের বইয়ের চাহিদা ৩০ জানুয়ারি মধ্যে দিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে আজ বুধবার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আশা করছি, দুই-একদিনের মধ্যে তারা চাহিদা পাঠাবে।’  

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, এ বছর মাধ্যমিকস্তরের বইয়ের মাননিয়ন্ত্রণ করতে বালটিক নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বহীনতার কারণে পিএ প্রিন্টার্সসহ বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে বই দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তাদের কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হয়েছে। বালটিক ১২ বছর ধরে কাজ করলেও এবার তাদের আর দায়িত্ব না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

এ ব্যাপারে এনটিসিটির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর ড. মিয়া মো. এনামুল হক রতন সিদ্দিকী আজকালের খবরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান ২২ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরবেন। প্রথম বৈঠকে বেশ কয়েকটি এজেন্ডা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পরিদর্শন টিমের বিষয়টি রয়েছে। আর কাউকে এককভাবে কাজ দেওয়া হবে না।’

এদিকে মুদ্রণ সমিতির নেতারা অভিযোগ করেছেন, এনটিসিটির বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহার দায়িত্বহীনতার কারণে চলতি বছরের বই ছাপার বিল গতকাল পর্যন্ত পাননি। তিনি কাউকে আর্থিক দায়িত্ব না দিয়ে প্রায় এক মাস ধরে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তারা বই ছাপিয়ে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করেছেন। টাকা না দেওয়ায় এখন বাড়তি সুদ গুনতে হচ্ছে। গত বছরও একই ঝামেলা করেছিলেন চেয়ারম্যান। 

তাদের আরও অভিযোগ, বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রাথমিকের বই ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থাটিকে বাদ দেওয়ায় তাদের শর্তানুযায়ী আন্তর্জাতিক দরপত্রের দরকার নেই। কিন্তু চেয়ারম্যান প্রতিবেশী একটি দেশের ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দিতে তৎপর। তিনি আন্তর্জাতিক দরপত্রে টেন্ডার আহŸান করতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। গত বছর মার্চ মাসেও বিদেশি প্রতিষ্ঠান শতভাগ বই সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এবারও আন্তর্জাতিক দরপত্রে টেন্ডার আহ্বান করলে সরকারের টার্গেট ভেস্তে যেতে পারে। 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ আজকালের খবরকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক ১০ শতাংশ টাকা দিয়ে শতভাগ খবরদারি করে। তারা নানা জটিলতা তৈরি করত। নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো। এবার সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বই ছাপানো হবে। বিশ্বব্যাংককে বিদায় করায় আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।’ 

মুদ্রণশিল্প সমিতির চেয়ারম্যান তোফায়েল খান আজকালের খবরকে বলেন, সরকার চাইলে আমরা তিন মাস আগেও বই ছাপিয়ে সরবরাহ করতে পারব। তবে প্রশ্ন আছে দুটি। একটি হলো- বই ছাপার বাজেটের অর্থ ছাড় করতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর লেগে যায়। কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে এনসিটিবির ঠিকাদারদের টাকা দিতে পারবে কি না? নির্ধারিত সময়ে ঠিকাদারদের টাকা দিলে কোনো সমস্যা হবে না। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো- চেয়ারম্যান দেশীয় মুদ্রণশিল্প প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বাদ দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। তিনি ঠিকাদারদের বিল না দিয়ে বিদেশ চলে গেছেন। অদক্ষ চেয়ারম্যানকে দিয়ে সঠিক সময়ে বই ছাপার কাজ শেষ হবে কি না?

আজকালের খবর/এসএ



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com