মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
সহসা কারামুক্তির আশা ক্ষীণ খালেদা জিয়ার
আশীষ কুমার সেন
Published : Tuesday, 13 February, 2018 at 9:27 PM

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সহসাই কারামুক্তির আশা ক্ষীণ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে আছেন তিনি। তার আইনজীবীরা বলছেন, রায়ের অনুলিপি পেলে বুধবার জামিনের আবেদন করবেন উচ্চ আদালতে। 

এদিকে কুমিল্লার একটি মামলায় খালেদা জিয়াকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে বলে গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তা সঠিক না হলেও ওই মামলায় তার (খালেদার) বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার সংলগ্ন জগমোহনপুর এলাকায় বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ওই মামলায় গত ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ ৪৯ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

এছাড়া আরও দুটি দুর্নীতি মামলায় তাকে আদালতে হাজিরা পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। গ্যাটকো এবং নাইকো দুর্নীতির এ দুটি মামলায় এর আগে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা রয়েছে, যার একটি একটি করে সামনে আসতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মামলায় জামিন পেলেও অন্য যে মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে এবং যেগুলো সামনে আসবে, সেগুলোরও জামিন না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা কম। 

বিএনপি চেয়ারপারসনের অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া গতকাল মঙ্গলবার বলেন, রায়ের কপি পেলে তারা বুধবার (আজ) আপিল জমা দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে সানাউল্লাহ মিয়াসহ চার আইনজীবী কারাগারের সামনে যান। পরে সেখান থেকে তারা যান কারা অধিদফতরে।

সে সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, কিছু কাগজপত্রে ম্যাডামের সই লাগবে। এ কাজেই এসেছি। বেরিয়ে এসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলব। প্রায় ৪৫ মিনিট পর তারা কারা অধিদফতর থেকে কারাগারের মূল ফটকে এসে অপেক্ষা করেতে থাকেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না পাওয়ায় বিকাল ৩টার দিকে ফিরে যান। সানাউল্লাহ মিয়া সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, আগামীকাল (বুধবার) এ মামলার রায়ের কপি পেলে আমরা জামিনের জন্য আবেদন করব। এ আইনজীবী জানান, তারা যে ওকালতনামা এনেছিলেন খালেদা জিয়ার সইয়ের জন্য, সেগুলো কারা কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষ এগুলো গ্রহণ করেছেন। তারা (কারা কর্তৃপক্ষ) বলেছেন, এগুলোতে স্বাক্ষর নিয়ে পরে আমাদের ফেরত দেবেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়াকে অন্য (কুমিল্লার) মামলায় গ্রেফতার দেখানোর যে খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তা সঠিক নয়। আমরা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে জানতে চেয়েছি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে খবর এসেছে, তা ঠিক কি না। তারা আমাদের জানিয়েছেন, তার (খালেদার) বিরুদ্ধে সে রকম কোনো অর্ডার আসেনি। কারাগারের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তিনটি ওকালতনামা নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলো গ্রহণ করে ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন। ওইদিনই ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান জিয়া ওই মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেন আদালত।  

খালেদা জিয়ার প্যানেল আইনজীবী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ আজকালের খবরকে বলেন, আদালতের রায়, এজাহার, সাক্ষী, জেরা, অভিযোগপত্র, ফরোয়ার্ডিংসহ সব কাগজ মিলে ছয় হাজার পৃষ্ঠার উপরে হবে রায়ের অনুলিপি। ওই অনুলিপি কোর্ট ফোলিওতে প্রিন্ট হয়ে গেছে। 

জয়নুল আবেদীন মেজবাহ বলেন, পাঁচ থেকে ছয়জন অনুলিপিকারক এ নিয়ে কাজ করছেন। কোনো ভুলভ্রান্তি হচ্ছে কি না, তারা তা মিলিয়ে দেখছেন। এ নিয়ে তারা বেশ ব্যস্ত। কথা বলার ফুরসত পাচ্ছেন না। 

জয়নুল আবেদীন মেজবাহ আরও বলেন, কারেকশনের পর প্রধান অনুলিপিকারক চ‚ড়ান্তভাবে মিলিয়ে দেখবেন কোনো ভুল হলো কি না। এর পর বিচারক সেই অনুলিপিতে স্বাক্ষর করবেন। বিচারকের স্বাক্ষরের পর ওই আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বাক্ষর করবেন। এরপর অনুলিপিতে কোর্ট ফি লাগানো হবে। আর সব কাজ সম্পন্ন হলেই এ মামলার রায়ের কপি পাওয়া যাবে। কপি পাওয়ার পর উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

অনুলিপি পাওয়ার পরের ধাপ
রায়ের অনুলিপির কপি দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ওই আপিলে জামিনের আবেদন করা হবে। জামিন মঞ্জুর করা হলে ওই আদেশ ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ ড. আখতারুজ্জামানের আদালতে পাঠানো হবে। এরপর আদালতে আবার জামিননামা দাখিলের অনুমতি চাইবেন আইনজীবীরা। বিচারক ওই জামিননামা দেওয়ার অনুমতি দিলে খালেদা জিয়ার পক্ষে মুচলেকা (বন্ড) দিতে হবে। তখন একটি রিলিজ আদেশ কারাগারে পাঠানো হবে। ওই রিলিজ আদেশ পাওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবেন, যদি ইতোমধ্যে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো না হয়।  

এদিকে ২০০৮ সালে শাহবাগ ও তেজগাঁও থানায় দায়ের করা গ্যাটকো ও নাইকো দুর্নীতির দুই মামলায় খালেদা জিয়াকে পৃথক দিনে আদালতে হাজির হতে পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। গত সোমবার এ পরোয়ানা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ফলে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি গ্যাটকো এবং ৪ মার্চ নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে আদালতে হাজির হতে হবে। জিয়া চ্যারিটেবল দুর্নীতি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ পর্যায়ে। এছাড়াও বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলায় হাজিরার তারিখ রয়েছে। এসব মামলায় খালেদা জিয়াকে সশরীরে আদালতে হাজির থাকতে হবে। খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া জানান, গ্যাটকো এবং নাইকো দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় তাকে আদালতে উপস্থিত না থেকে আইনজীবীর মাধ্যমেই তিনি হাজিরা দিয়ে আসছিলেন। 

দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল আজকালের খবরকে বলেন, কোনো মামলায় কারও একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলে সব নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বারের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশে খালেদা জিয়ার অন্য মামলাগুলো সামনে নিয়ে আসছে সরকার। তবে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে তাকে কারাগার থেকে বের করে আনা হবে।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে দুর্নীতি, ভুয়া জন্মদিন, মানুষ হত্যা, নাশকতা, মানহানিসহ নানা অভিযোগে ৩৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলা দুর্নীতির। তা হলো- গ্যাটকো দুর্নীতি, নাইকো, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতির মামলা। ৩৬টি মামলার মধ্যে চারটি সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আমলে, বাকি মামলা বর্তমান সরকারের আমলে করা হয়। এর মধ্যে ১৯টি মামলা বিচারাধীন। এছাড়া তদন্তাধীন রয়েছে আরও ১২টি মামলা।

৮ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী সলিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ এবং দুই কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। 

সাজা ঘোষণার পর খালেদা জিয়াকে নাজিমউদ্দীন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। রায় ঘোষণার তিন দিন পর গত রবিবার থেকে আদালতের নির্দেশে তাকে ডিভিশন বা প্রথম শ্রেণির বন্দির মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। 

আজকালের খবর/এসএ



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com