মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
ডিসেম্বরের আগেই নির্বাচন!
হাবীব রহমান
Published : Monday, 12 February, 2018 at 10:01 PM, Update: 13.02.2018 2:33:38 PM

খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই নির্বাচনের পথে এগুচ্ছে দেশ। ডিসেম্বরের আগেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চায় ক্ষমতাসীনরা। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডের পর অন্যান্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো এবং সামনে আরও মামলার রায় থাকায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। বিএনপিকে চলমান অগোছালো অবস্থায় রেখে ডিসেম্বরের আগেই নির্বাচনের পরিকল্পনা সরকারের হাতে। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো দিন-তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। আওয়ামী লীগ তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সিগন্যাল পেলেই ডিসেম্বরের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে যাবে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে আলাপকালে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এমন আভাস পাওয়া গেছে।

আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের এক কেন্দ্রীয় নেতা আগামী মে-জুনের মধ্যে নির্বাচনের আভাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ আরেক সিনিয়র সংসদ সদস্য এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের। সেটা ডিসেম্বরেই হবে এমন  কোনো কথা নয়। তবে তিনি কোনো মাস-তারিখের কথা বলেননি। 

সোমবার দিনের বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের পাঁচ জন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা হয়। তারা স্বীকার করেছেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সরকার যেকোনো সময় চাইলেই নির্বিঘেœ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্রের মনোভাব যাচাই করার কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে, বিএনপিবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যেসব রাষ্ট্র আগ বাড়িয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছে এবং দেশের বিভিন্ন বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে যেসব দেশ অর্থায়ন করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য নেতারা ডিসেম্বরে নির্বাচনের কথা বলে আসলেও, আক্ষরিকভাবে ডিসেম্বরকেই মিন করেননি। এ বক্তব্যে মূলত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়েছে। 

আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, ডিসেম্বরের আগে নির্বাচনের বিষয়ে সরকার সংবিধানের আলোকেই কৌশলী অবস্থান নিতে পারে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। আর ১২ জানুয়ারি বর্তমান সরকার গঠিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ১১ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা আছে। সে হিসেবে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর যেকোনো দিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে যেকোনো সময় নতুন নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দিতে পারেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রুটিন অনুযায়ী এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হবে আগামী ১৩ মে। আর ১৮ জুন শুরু হতে পারে পবিত্র রমজান। মাঝের এই সময়টাতেও একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমÐলীর এক নেতা বলেছেন, নির্বাচনের বছর যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে। তখন এটাকে আগাম নির্বাচন বলা হয় না; নিয়মমাফিক নির্বাচন হিসেবেই ধরা হয়। সাম্প্রতিক সময়েও কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধান জনপ্রিয়তা যাচাই করার জন্য এমন নির্বাচন দিয়েছেন।  

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগে থেকেই সংসদে থাকা আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির নির্বাচনী প্রস্তুতিকে অনেকেই রহস্যজনক হিসেবে দেখেছেন। দণ্ডিত হওয়ার আগে দলের নির্বাহী কমিটির এক বৈঠকে খালেদা নিজেও এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘নৌকা কি এতই ডুবে গেছে যে, এক বছর আগ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।’

সূত্র জানায়, দলীয় হাইকমান্ড থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশনার পর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি পুরোদস্তুর নির্বাচনী প্রচারে নেমে গেছেন অনেক আগেই। গত তিন-চার মাস ধরে এলাকায় যাওয়া-আসা তাদের আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।

নির্বাচনী প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ। তাদের গণসংযোগ, সদস্য সংগ্রহ অভিযান, গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক, উন্নয়ন কর্মকাÐ জোরদারের বিষয়ে অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি চলছে। দলীয় কোন্দল মেটানোর লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব প্রার্থীকেই জনসংযোগে থাকতে বলা হয়েছে। নির্দেশ রয়েছে কেউ যেন কারো বিরুদ্ধে না লাগে। জনপ্রিয় প্রার্থীকেই শেষ বেলায় নৌকার টিকিট দেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ আজকালের খবরকে বলেন, অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ সব সময়ই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সব সময়ই জনগণের ম্যান্ডেটকে গুরুত্ব দিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সম্ভবত চলতি বছরের ডিসেম্বরের দিকে জাতীয় নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের তরফ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে।
তবে আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন বিএনপি অনেক অগোছালো। তাদের দলীয় চেয়ারপারসন দুর্নীতির মামলায় কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান বিভিন্ন মামলায় দণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসিত জীবন পার করছেন। এ সময়ে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে খালেদা জিয়ার ছয় শর্তের কতটা মানা হবেÑ এমন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংবিধানের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারো জন্য নির্বাচন থেমে থাকবে না।

আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আর কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন তিনি চান না- এ বক্তব্যের আলোকে বিএনপিকে ছাড়া যদি আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে কিনাÑ এমন প্রশ্নে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ দেশে জিয়াউর রহমানের ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের নির্বাচন, এরশাদের ’৮৬ ও ’৮৮ সালের নির্বাচন, বিএনপির ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, ২০০১ সালের নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। প্রধানমন্ত্রী এমন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চান না বলেই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও সাংবিধানিক নির্বাচনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সংবিধান মেনেই বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। আর যদি নির্বাচনে না আসে তাহলে নির্বাচন বানচাল তো দূরের কথা, কোনো ‘শব্দ’ও করতে পারবে না।
 
বিএনপির সঙ্গে সংলাপ বা সমঝোতার সব প্রস্তাব আগের চেয়েও কড়া ভাষায় নাকচ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সংলাপে যাবে না আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, বারবার বিএনপি নেত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে সংলাপের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে অনেক আগেই। আর খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সমঝোতার লাইন শেষ। ৫ জানুয়ারির আগে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রীকে ফোন দিয়েছিলেন। সাড়া মেলেনি। সে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি রক্তপাত করেছিল। এমন শত মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে বেইমানি করে আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসতে পারে না। বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন সম্ভব কি না- এমন প্রশ্নে খালিদ বলেন, ৫ জানুয়ারি সম্ভব হলে, হোয়াই নট নেক্সট!

জানা যায়, নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল রাখা না রাখা ও আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের বিষয় নিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিকে আদালতের এখতিয়ার বলছেন সংশ্লিষ্টরা। আর আগের মতোই নির্বাচনের সময়ে সংসদ ভাঙার পক্ষে না ক্ষমতাসীনরা।

আজকালের খবর/এসএ



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com