মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটে ঘেরাও ঢাকা বোর্ড
নূরুজ্জামান মামুন
Published : Monday, 12 February, 2018 at 9:16 PM, Update: 13.02.2018 2:34:13 PM

ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানের পদটি প্রায় দুই মাস ধরে শূন্য। বোর্ডের সচিব মো. শাহেদুল খবিরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের অর্থনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক। চেয়ারম্যানের পদটি সিনিয়র প্রফেসর পদ মর্যাদার। এ বোর্ডের চেয়ারম্যানকে মাউশির (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর) মহাপরিচালকের পদে বসানো প্রথায় পরিণত হয়েছে। সচিবের পদটিও সিনিয়র অধ্যাপক পদ মর্যাদার। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদাধিকার বলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব কমিটির সভাপতি। প্রফেসর না হলেও মো. শাহেদুল খবিরকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ায় পদটির ‘অমর্যাদা’ হচ্ছে বলে একাধিক বোর্ডের চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছেন। প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা শাহেদুল খবিরের সঙ্গে বৈঠক করতেও বিব্রত হচ্ছেন। বিষয়টি দেখেও না দেখার ভ্যান করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চেয়ারম্যান ও সচিবের নিচের দুটি পদও প্রফেসর পদমর্যাদার। অধ্যাপক পদ মর্যাদার কাউকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব না দেওয়ায় তারও ক্ষুব্ধ। চলমান এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বোর্ড। এ ধরনের ‘উদ্ভট’ পরিস্থিতির মধ্যেই চলছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড।

অভিযোগ রয়েছে, শাহেদুল খবির চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ওই সময়ে ‘জা’ অধ্যাক্ষরের একই সংগঠনের এক ‘বড় ভাইর’ শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ওই বড় ভাই বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্তি সচিব। তিনিই শাহেদুল খবিরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তাকে বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন ‘বড় ভাই’। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে কাউকে স্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। 

২০০৯ সালে প্রথমে শাহেদুল খবির বোর্ডের স্কুল পরিদর্শক হিসেবে প্রেষণে দায়িত্ব পান। পরে ভারপ্রাপ্ত সচিব। সেখান থেকে সচিব হন। অর্থাৎ টানা নয় বছর এই বোর্ডে প্রেষণে আছেন। চাকরি বিধি অনুযায়ী তিন বছরের বেশি সরকারি কর্মকর্তারা প্রেষণে থাকতে পারেন না। এ বিধি লঙ্ঘন করেই তিনি বোর্ডে বহাল আছেন। বিসিএস সাধারণ শিক্ষক সমিতির অনুমোদন ছাড়াই তিনি নতুন সরকারি কলেজ শিক্ষকদের পদমর্যাদ নিয়ে একটি মামলা করেছেন। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সরকারি কলেজবিহীন উপজেলায় একটি কলেজ সরকারিকরণ আটকে গেছে।  

অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহেদুল খবির আজকালের খবরকে বলেন, বদলি-পদায়ন সরকারের ইচ্ছা। আমাকে   দেওয়া দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছি। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি মিথ্যাচার।

২০০৯ সালে উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হয়ে বোর্ডে আসেন তপন কুমার সরকার। বর্তমানে তিনি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। এই পদটিও সিনিয়র অধ্যাপক পদ মর্যাদার। আর তপন কুমার পদার্থ বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক। অভিযোগ রয়েছে, তার ইশারা ছাড়া এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে নির্ধারণ হয় না। তিনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অখ্যাত বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেন। এটি প্রশ্নফাঁস হওয়ার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষায় রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত একাধিক ক্যাম্পাসে পরিচালিত ট্রাস্ট কলেজে কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছেন তিনি। মাইলস্টোন ও ট্রাস্ট এই দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের একে অন্যের প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার বিশেষ সুবিধা দিতেই এ আয়োজন। অভিন্ন ক্যাম্পাস ছাড়া কেন্দ্র অনুমোদনের বিধান না থাকলেও ঘুষ নিয়ে সে কাজটি করেছেন তপন। 

রাজধানীর এয়ারপোর্ট সড়কের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে প্রায়ই এক শিক্ষা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। চলমান এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানালেও তপন কুমার কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং প্রতিদিন কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বোর্ডে গিয়ে তপন কুমার সরকারকে পাওয়া যায়নি। বিকালে একাধিকবার মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।  

কলেজ পরিদর্শক ড. মো. আশফাকুস সালেহীন ২০০৯ সাল থেকেই প্রেষণে বোর্ডে আছেন। এর আগে তিনি মাউশির উপপরিচালক ছিলেন। কলেজ পরিদর্শক পদটি সিনিয়র অধ্যাপক মর্যাদার হলেও এ সহযোগী অধ্যপক বহু বছর ধরে আকরে রেখেছেন। তবে সম্প্রতি তিনি প্রফেসর হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কলেজের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আসন নির্ধারণে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ‘বাণিজ্যিক কলেজ’ মালিকদের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য রয়েছে। সম্প্রতি তিনি উত্তরা স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি গ্রæপকে ম্যানেজিং কমিটি পাইয়ে দিতে সহায়তা করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একুশে পদকপ্রাপ্ত একটি পত্রিকার প্রখ্যাত সম্পাদক জড়িত। শুধু আর্থিক কারণে তাকে ওই কলেজ থেকে বের করতে সহায়তা করেন সালেহীন। শিক্ষামন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পরও একজন অতিরিক্ত সচিব তাকে আগলে রেখেছেন। এসব বিষয়ে বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে।
বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক এ টি এম মইনুল হোসেন ২০১৩ সাল থেকে প্রেষণে কর্মরত আছেন। ২০০৯ সালে মাউশির উপপরিচালক (কলেজ-১) পদে কর্মরত ছিলেন। ওই পদে থাকাকালিন তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি তিনি পদোন্নতি পেয়ে প্রফেসর হয়েছেন। এরপর আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ছাড়া কোনো স্কুলের পাঠদান ও স্বীকৃতির প্রতিবেদন দেন না তিনি। রাজধানীর নামকরা স্কুলে ভর্তি ব্যাণিজ্যের সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি দুদকের সুপারিশে রাজাধানীর সরকারি হাইস্কুলের ২৫ কোচিংবাজ শিক্ষককে ঢাকার বাাইরে বদলি করেছে মন্ত্রণালয়। আরও ৫২২ জনকে বদলির প্রক্রিয়া চলছে। আর এমপিওভুক্ত ৭২ জনকে কারণ দর্শানো হয়েছে। তাদের রক্ষায় অভিভাবকদের মাঠে নামানোর ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। কোচিংবাজ শিক্ষকদের সঙ্গেও তার সখ্য রয়েছে। তাদের কাছ থেকে মাসোহারার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। 

বাংলা বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদা বেগম। ২০০৯ সাল থেকে তিনি উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (সনদ) পদে কর্মরত আছেন। এ পদে থেকেই টেম্পারিং করে নিজের মেয়ের পরীক্ষার ফল বদলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি মাইক্রোবাস কিনে বোর্ডের কাছে মাসিক ৮০ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছেন মাসুদা বেগম। ওই মাইক্রোবাসটি তিনিই ব্যবহার করেন বলে বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেই রাজধানীর আনন্দময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতির পদটি বাগিয়ে নেন। নিজের মেয়ের হাউস টিউটরকে ওই স্কুল চাকরি, এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে স্কুলের টাকা রাখাসহ স্কুলের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।  
অভিযোগের বিষয়ে মাসুদা বেগম বলেন, ‘রেজাল্ট টেম্পারিংয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ওই সময়ে বোর্ডের ধারেকাছেও যাইনি। আমি লোন নিয়ে একটি গাড়ি কিনেছি। সেটা বোর্ডের কাছে ভাড়া দেইনি। স্কুলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সবই ষড়যন্ত্র।’  

শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক একান্ত সহকারী (এপিএস) মনমন্থন রঞ্জন বাড়ৈ ২০১৩ সাল থেকে বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক পদে কর্মরত। এপিএস থাকাকালীন তিনি মন্ত্রণালয়ে ‘দুর্নীতির হাট’ বসিয়েছিলেন। ওই সময়ের তার গড়া সিন্ডিকেট এখনও মাউশিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে তাকে সরিয়ে পাঠানো হয় ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে। অভিযোগ রয়েছে, তার সঙ্গে ‘জা’ অধ্যাক্ষরের একজন অতিরিক্ত সচিবের সখ্য রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক এই এপিএসের নির্দেশ ছাড়া শিক্ষা প্রশাসনে কোনো বদলি, পদোন্নতিসহ কোনো কাজ হয় না। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন কেনাকাটায় এক বছরের ১০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেন বর্তমান মাউশির ডিজি অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান। তাকে বিদায় করতে বোর্ডের সিন্ডিকেট নানা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। 

ব্যবস্থাপনা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক অদ্বৈত কুমার রায়। তিনি ২০১৩ সাল থেকে বোর্ডের বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন। এর আগে ২০০৯ সাল থেকে মাউশির উপপরিদর্শক (কলেজ-১) পদে ছিলেন।  উপপরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. ফজলে এলাহী ২০১০ সাল থেকে বোর্ডের বিভিন্ন পদে ছিলেন। উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আল মাসুদ করিমও তিন বছর পার করেছেন বোর্ডে। 

উপসচিব (প্রশাসন ও সংস্থাপন) মুহাম্মদ নাজমুল হক ২০০৯ সাল থেকে বোর্ডে ‘খুঁটি গেড়েছেন।’ এর আগে তিনি উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও উপসচিব পদে ছিলেন। উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তারেক বিন আজিরও তিন বছর পার করতে যাচ্ছেন।

উল্লিখিত সব কর্মকর্তাই বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের। তাদের মূল পদ সরকারি কলেজ। তবে শিক্ষার্থীদের পড়াতে আগ্রহী নন তারা। ঘুরেফিরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন ‘লাভজনক প্রশাসনিক’ পদ আকরে রয়েছেন। 

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আই কে সেলিমুল্লাহ খন্দকার আজকালের খবরকে বলেন, অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষক বছরের পর বছর প্রত্যন্ত এলাকার কলেজে চাকরি করছেন। আর কিছু ব্যক্তি শিক্ষকতা বাদ দিয়ে ঘুরেফিরে লাভজনক পদে থাকছেন। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে প্রচÐ ক্ষোভ রয়েছে। এতে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়ন করলে এসব ঝামেলা থাকতো না।

গত বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে বলা হয়, তিন বছরের বেশি এবং চাকরি জীবনে দুইবারের বেশি কোনো শিক্ষক প্রশাসনিক পদে থাকতে পারবেন না। তবে এসব কর্মকর্তাদের বদলি করছেন না ‘জা’ অধ্যাক্ষরের অতিরিক্ত সচিব। বর্তমানে তিনি বিদেশ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।


আজকালের খবর/এসএ



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com