মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
প্রাণ পাক লিটলম্যাগ
মাসুম বিল্লাহ
Published : Thursday, 8 February, 2018 at 5:44 PM

লেখালেখির আঁতুড়ঘর হলো-লিটলম্যাগ। সেকারণেই লিটলম্যাগ বাংলা সাহিত্যে এক অন্যন্য স্থান দখল করে আছে। কিন্তু বর্তমানে লিটলম্যাগের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে শুনতে পাই। এবারের বইমেলায় একজন ছোকড়াকে বলতে শুনি : লিটলম্যাগ হলো- কবি-লেখকদের আড্ডা দেওয়ার স্থান, এখানে কবি লেখকরা আড্ডা দেবে, এখানে বই বিক্রির জন্য তারা আসে না। বই বিক্রির জন্য উদ্যানের স্টল আছে। প্রথমে একটু অবাক হলেও পরে ধাতস্থ হই, কেননা, এবার লিটলম্যাগের চত্বর উদ্যানের অংশে এক কোণে বরাদ্দ দিয়েছিল, কিন্তু গুটি কয়েক লিটলম্যাগ কর্মী নাকি আন্দোলন, প্রতিবাদ, আবেদন করে লিটলম্যাগ চত্বরকে বাংলা একাডেমির অংশে আবার ফিরিয়ে আনে। তাদের যুক্তি : এটা লিটলম্যাগের এতিহ্য। সবসময় এখানেই লিটলম্যাগ হয়ে আসছে। এখানে লেখক-কবিরা মিলিত হন, আড্ডা দেন।’’ এই কারণে উপরোক্ত ছেলেটির পুরোপুরি দোষ দেখি না, সে যা-শুনেছে, তাই বলেছে। প্রতিটি স্টলেই প্রতিবছর নতুন নতুন ছেলে-মেয়ে দেখতে পাই, যাদেরকে সামান্য বেতনের বিনিময়ে একমাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। যাদের নূন্যতম ধারণা নেই লিটলম্যাগ সম্পর্কে।

একমাত্র একজন লিটলম্যাগ স্রষ্ঠা, কর্মী, এর লেখক-কবি মাত্র উপলব্ধি করতে পারেন ম্যাগের প্রতি ভালোবাসা, দরদটা। আমি আমার কথা বলতে পারি : আমার মনের কোণেও উঁকি দিয়েছিল আমার যদি একটা লিটলম্যাগ থাকত। আমি আমার লেখা নিজের মতো ছাপতে পারতাম। বিষয়টি কল্পনায় ভাসতেই যে উত্তেজনা, শিহরণ জেগেছিল তার তুলনা হয় না। তারপরই জন্ম নিল মাসুম বিল্লাহর দৌড়ঝাঁপে [ ম ] লিটলম্যাগটি। প্রথম সংখ্যার উত্তেজনা এই স্বল্প পরিসরে লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। টানা এক মাস আমি [ ম ] এর প্রথম সংখ্যার জন্য ছুটে বেরিয়েছি। লেখা সংগ্রহ, ছাপাখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছি। নতুন লেখকের কাছ থেকে লেখা নিয়ে তার পরিমার্জন করার আনন্দ, হ্যাঁপা অনেক। বিখ্যাত লেখকদের কাছ থেকে দু-চারটি লেখা নেওয়ার মধ্যেও উত্তেজনা ব্যাপক। তাদের লেখার পাশে নতুনরেও লেখা ছাপা হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তারপর প্রথম সংখ্যা প্রকাশের দিনক্ষণ এগিয়ে আসা, একসময় তা আলোর মুখ দেখে। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের আনন্দটা প্রথম সন্তানের মুখ দেখার মতো।
এমনি করে প্রতি বছর সারা দেশে অসংখ্য লিটলম্যাগের সৃষ্টি হচ্ছে, আবার মৃত্যুও হচ্ছে। কেননা একটি লিটলম্যাগ প্রকাশের হ্যাঁপা অনেক। প্রথম সংকট এর আর্থিক টানাপড়েন। এর ব্যয়ভার ব্যক্তিকেই বহন করতে হয়। দেখা যায়, অধিকাংশ সম্পাদক আর্থিকভাবে অক্ষম। তবুও সে নানাভাবে, নানা চেষ্টায় নিয়মিত, অনিয়মিত তার পত্রিকাটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। এই টিকিয়ে রাখার গল্পগুলো আমরা কখনো জানি, কখনো বা চিরকাল চাপাই পড়ে থাকে। দ্বিতীয় হ্যাঁপা লেখা সংগ্রহ, লেখা বাছাই, লেখা ছাপা হওয়া, না-হওয়া নিয়ে। প্রথমত প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখকই লিটলম্যাগকে লেখা দিতে চান না। এ পত্রিকাকে তারা মানহীন ও অগুরুত্বপূর্ন মনে করেন। মনে এখানে লেখা দেওয়া মানে তার লেখাটির মাঠে মারা যাওয়া। সেকারণেই তারা একজন লিটলম্যাগ সম্পাদককে দিনের পর দিন কথাই দিয়ে যান শুধু, কথা আর রাখেন না। তবে সবাই একরকম নন। কেউ কেউ আলাদা, অন্যরকম সুন্দর। অনেক তরুণ লিখিয়ের ছাপার অযোগ্য লেখাটিও ঘষেমেজে ছাপার উপযোগী করে ছাপতে হয়। কারণ এভাবেই একটি চারাগাছ আলো-বাতাস পেয়ে একদিন পরিপূর্ণ বৃক্ষে মাথা উঁচু করে। আবার কারোর কোনো লেখা ছাপা না-হলে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। অনেক সম্পাদক তার পত্রিকার জন্য কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞাপন নিয়ে আর্থিক সংকট মোকাবেলা করতেও নীতিবিরুদ্ধ মনে করেন। অনেকে আবার এর উল্টোটাও করেন। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন নিয়ে তার পত্রিকার ব্যয়ভার মেটান। এটাকে কেউ কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়াও মনে করনে। তবুও একটি পত্রিকা বের করা চাট্টিখানি কথা নয়।

এখানে লিটলম্যাগ এর মূলভাব বা ধারাটা হলো : লিটলম্যাগ সবসময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানবিরোধী হবে। নিজেরা নিজেদের লেখাকে প্রকাশ করবে। কিন্তু কখনো দৈনিক পত্রিকা, মাসিক সাহিত্য পত্রিকা লেখা পাঠাবে চায় না। যদিও সেখানে লেখা ছাপানো এতোটা সহজ নয়। বিধায় লিটলম্যাগের জন্ম হয়। এখান থেকেই এক একজন লেখকের জন্ম হয়। লিখে লিখে হাত পাকায়। তবে অনেকে লিটলম্যাগ থেকে বেরিয়ে এসে মূল স্রোতে নিজেকে মেলে ধরেন, অনেকে আবার চিরকাল লিটলম্যাগকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছেন। তবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী শব্দটা আমার কাছে সাংঘর্ষিক মনে হয় না। লিটলম্যাগ একটি মাধ্যম। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান একটি মাধ্যম। দুইয়ের সমন্বয় হলে দোষের দেখি না। লিটলম্যাগে লিখতে লিখতে একসময় একজন লেখক সব স্তরে লিখবে। এভাবেই সাহিত্যেও বিকাশ ঘটবে। অনেকে আবার লিটলম্যাগকে শুধুমাত্র লেখক-কবিদের একান্ত বিষয় বলে চিহ্নিত করেন। সৃষ্টিশীল এক একটি নান্দনিক পত্রিকাকে পাঠক-ক্রেতার নাগালের বাইরে রাখতে চায়। এদের সঙ্গে আমি একমত নই। আমার কাজ, আমার সৃষ্টিকে যদি অন্যের সামনে তুলে ধরতে, পৌঁছে দিতে না-পারি, তাহলে আমার সৃষ্টির মূল্য কোথায়। একটি লিটলম্যাগ তো শুধূমাত্র সম্পাদক, লেখক-কবি আর বিজ্ঞাপনদাতার জন্য নয়। এটার পাঠক-ক্রেতার জন্যও। সেকারণে সারাদেশ থেকে যে সমস্ত লিটলম্যাগ প্রকাশিত হয় সেগুলোর একমাত্র প্রদর্শনী সম্ভব হয় একুশের বইমেলায়। কিন্তু বইমেলা দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় এবং গুটি কয়েকের দাবীর কারণে লিটলম্যাগ নতুন পাঠকশ্রেরির কাছে যাচ্ছে না। বাংলা একাডেমী থেকে মূল বইমেলা সরে উদান্যের অংশে চলে যাওয়ার পর থেকে লিটলম্যাগ চত্বর একা এবং নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে প্রতি বছর। আমার পরিসংখ্যানও তাই। বইমেলায় মানুষ বই কিনতে আসে। তাই বইমেলা থেকে লিটলম্যাগ অচেনা নতুন পাঠক-ক্রেতার কাছে পরিচিত হলে দোষের কী আছে? আবার লিটলম্যাগ লেখকরা কী শুধু লিটলম্যাগে লিখে? তাদের কী একক বই বের হয় না? তাহলে তাদের বইগুলো কোথায় প্রদর্শিত হবে? কারা সে বইগুলো দেখবে? কিনবে? যদি না পাঠক-দর্শক লিটলম্যাগ চত্বরে না-আসে। সেকারণেই লিটলম্যাগ এবং এর চত্বরকে মূল মেলার অংশের বাইরে রেখে লিটলম্যাগের প্রসারণ উৎকর্ষতা সম্ভব নয়। আর এর বিকল্পও দেখি না। কারণ, সারা বছরে এই একবারই সবার একত্রে মিলিত হওয়ার সুযোগ মেলে। আমরা এই মাসের জন্য অপেক্ষা করে থাকি। সেখানে দর্শক থেকে, পাঠক থেকে, ভিড় থেকে বঞ্চিত। আমার তো আফসোস হয় কত সুন্দর সুন্দর এক-একটি লিটলম্যাগ, যাদের অদ্ভতু সুন্দর সব নাম (কয়েকটি লিটলম্যাগের : লোক, মাদুলি, ঊষালোক, চিহ্ন, শিরদাঁড়া, অনুররণ, দাগ, প্রতিবুদ্ধিজীবী, স্বপ্ন ৭১, ম, প্রতিকথা, প্রকাশ, দৃষ্টি, ধমনী, শালুক সহ আরো শত শত নাম), নানন্দনিক সব সংখ্যা, লেখা, এখানে কত ভালো ভালো লেখকের কত লেখা স্থান পায়, অথচ তা থেকে পাঠক বঞ্চিত!

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও লিটলম্যাগ চত্বর নিমার্ণে বিলম্ব। যদিও কর্তৃপক্ষ এবার উদ্যানের অংশে ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছিল, কিন্তু স্থান পরিবর্তনের কারণে ৫ দিন বিলম্ব হয়েছে। এরপরও আলোর স্বল্পতা, লিটলম্যাগের ব্যানার কারা করবে? তা ঠিক না-হওয়া, লিটলম্যাগ কর্মীদের সঙ্গে স্টল নিমার্ণকর্মীদের অদাচরণ লিটলম্যাগ কর্মীদের বিব্রত করেছে বলা শোনা যায়। আবার অনেক লিটলম্যাগকে কোনো কারণ ছাড়াই স্টল বরাদ্দ না-দেওয়ার কথাও শোনা গেছে। উল্টো তারা অভিযোগ করেছেন-যারা স্টল বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না তারা স্টল বরাদ্দ পেয়েছে। এই প্রসঙ্গে বাতাসে কথা শোনা যায় : অনেকে প্রকাশনীর ব্যবসা করার জন্য তড়িঘড়ি করে তিনটি সংখ্যা কোনোরকম করে প্রকাশ করে জমা দেয় স্টল বরাদ্দ পাওয়ার জন্য। যাদের জন্য সাহিত্য এবং লিটলম্যাগের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। এরপর পাশাপাশি লিটলম্যাগ চত্বরে এবং স্টলের সামনে সরাসরি ধূমপান করারও কথা শোনা যায়। যা কিনা লিটলম্যাগ চত্বরে আগত দর্শনার্থীদের ব্রিবত করে। এছাড়াও লিটলম্যাগ কেন্দ্রিক প্রকাশনীর বাইরে কিছু ব্যবসায়ীক প্রকাশনী তাদের বই এসব স্টলে রেখে ব্যবসা করে যাচ্ছে প্রতি বছর। যাদের বইগুলো মানহীন। অতিরিক্ত দাম। যেমন- মোটু পাতলু, ছোটা ভিম, ভয়ংকর ভূতের গল্প জাতীয় বইগুলোতে কিছু স্টল ভরপুর থাকে। কর্তৃপক্ষ এসে তাদের নিষেধ করে যায়, কিন্তু খানিক পরে আবার যা-তাই। লিটলম্যাগের উম্মুক্ত চত্বেরে এই দৃশ্য বেশি দেখা যায়।

তবুও লিটলম্যাগের জয়রত এগিয়ে চলুক। নতুন করে প্রাণ পাক লিটলম্যাগ। প্রচারের সবটুকু আলো এসে পড়ুক লিটলম্যাগের ওপর। 


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com