মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
আসিয়ানের কাছ থেকে শিখতে পারে সার্ক: মাহবুবানি
Published : Friday, 26 January, 2018 at 5:46 PM

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে পরিচিত কূটনীতিকদের একজন তিনি। বর্তমানে শিক্ষাবিদ। নাম কিশোর মাহবুবানি। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসকে সামনে রেখে গত সপ্তাহে দিল্লিতে আসিয়ান-ইন্ডিয়া স্মারক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। আসিয়ানের ১০ দেশের নেতাই ২৬ জানুয়ারি  ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে  অতিথি ছিলেন। এ ঘটনাকে সামনে রেখে অধ্যাপক মাহবুবানি এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ভারতের ইংরেজি দৈনিক দি হিন্দু- কে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পত্রিকাটির সিনিয়র সাংবাদিক সুহাসিনী হায়দার

প্রশ্ন: আপনি আসিয়ানকে একটি বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন, এমনকি এই সংস্থাটিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার পর্যন্ত দিতে বলেছেন। কেন?
কিশোর মাহবুবানি:  প্রধান বিষয় হলো আঞ্চলিক সংস্থাগুলো যেন গঠিত হয় ব্যর্থ হওয়ার জন্যই। কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়েই গ্রুপিং হয়। ফলে গ্রুপটি সমমনাদের নিয়ে হয় না, হয় ভৌগোলিক দুর্ঘটনাক্রমে। আর বেশির ভাগ প্রতিবেশী দেশের থাকে বৈরিতা ও সমস্যার ইতিহাস। ফলে একত্রিত হতে তাদের ইতিহাসের চ্যালেঞ্জগুলো উতরাতে হয়। এতে করে তারা ভালো করতে পারে না। এর ব্যতিক্রম কেবল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও আসিয়ান। তবে যুদ্ধ বন্ধ করতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে দুটি বড় যুদ্ধ করতে হয়েছিল।
আর ওই ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই একই মাত্রার শান্তি ও সমৃদ্ধি হাসিল করেছে আসিয়ান। একই সঙ্গে দুনিয়ার বুকে আসিয়ানের মতো এত বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল আর কোথাও নেই। এখানে ৬০ কোটি লোকের বাস, এদের মধ্যে ২১ কোটি ৪০ লাখ হলো মুসলিম, ১১ কোটি খৃস্টান, দেড় কোটি বৌদ্ধ। এমনকি বৌদ্ধদের মধ্যেও আছে মহাযান ও হীনযান সম্প্রদায়। তারপর আছে তাওবাদী, কনফুসিয়ানবাদী, হিন্দু, কমিউনিস্ট ইত্যাদি নানা ধরনের লোকজন।

১৯৬৭ সালে জন্মের সময় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ছিল দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে গোলযোগপূর্ণ এলাকা। ইন্দো-চায়নায় (ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাউস) অনেক বোমা ফেলা হচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সমগ্র ইউরোপে যত বোমা ফেলা হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি বোমা পড়েছিল সেখানে। আমরা সবকিছু উৎরে এমন এক সম্প্রদায় গড়ে তুলেছি, যা আজ শান্তিপূর্ণ অঞ্চল।

ভারত ও পাকিস্তানের সমস্যা নিয়েও যদি দক্ষিণ এশিয়া কিংবা সৌদি আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য যদি এ মাত্রার সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, তবে লোকজন বলবে এটি একটি আশ্চর্য ঘটনা। এজন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত। আসিয়ান তা অর্জন করেছে।

প্রশ্ন: আজও কি আসিয়ান বিভক্ত নয়, যুক্তরাষ্ট্রপন্থী ও চীনপন্থী শিবির হিসেবে?
কিশোর মাহবুবানি: দেখুন অনেক ব্যাপারেই আসিয়ান দেশগুলো নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। উদাহরণ হিসেবে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুর কথা বলছি। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তবে ইসরাইলের সাথে সিঙ্গাপুরের খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যাপারে নানা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কম্বোডিয়ার মতো কেউ কেউ বেশি চীনপন্থী, আবার ভিয়েতনাম বেশি মাত্রায় আমেরিকাপন্থী। তবে একইসাথে চীন হলো ভিয়েতনামের এক নম্বর বাণিজ্যিক অংশীদার। ১৯৭৯ সালে চীন ও ভিয়েতনাম সীমান্তে উভয় পক্ষের ১০ লাখ সৈন্য মুখোমুখি অবস্থায় ছিল। আজ তা অতীত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যাপারে আসিয়ান দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থাকলেও তারা উভয়ের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলেছে।

প্রশ্ন: আপনি একবার বলেছিলেন, আসিয়ানের যাত্রা শুরু হয়েছিল চারটি অক্ষরের শব্দ দিয়ে- তা হলো ভয় (ইংরেজি ফেয়ার: এফ-ই-এ-আর) দিয়ে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের কমিউনিস্ট চীনের ভয়। সেটি কি এখনো তাদের পথ চলার নির্দেশনা নয়?
কিশোর মাহবুবানি:  সমাজতন্ত্রের বিস্তৃতির কারণে ১৯৬০-এ দশকে সেই ভয় ছিল। তখন রাশিয়া ও চীন ছিল একসাথে। চীন আসিয়ানকে নব্য-সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র-চীন নিক্সন প্রশমনে অবস্থার পরিবর্তন হয়। তারপর আসিয়ানের সব দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে চীন। এখন চীনা-ভীতি আর নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভৌগোলিক প্রতিদ্ব›িদ্বতা আসিয়ানকে বিভক্ত করে ফেলতে পারে বলে ভয় রয়ে গেছে।

প্রশ্ন:  আপনি লিখেছেন, চীনের সাথে ইন্দো-চায়নায় চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্পগুলোর মধ্যে আছে ‘ভরকেন্দ্র, বিষ বা শান্তি স্থাপন।’ আপনি এ দিয়ে কী বোঝাচ্ছেন?
কিশোর মাহবুবানি: চীনকে ঘিরে ফেলার মতো কিছু করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল। চীনের সব প্রতিবেশীই এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগদানে অস্বস্তিতে থাকবে। এমনকি জাপানও এ নিয়ে বেশ সতর্ক। তারা চীনের বিরুদ্ধে ভারসাম্য চায়, তবে চীনকে ঘিরে ফেলতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রও মিশ্র ইঙ্গিত দিয়েছে: অর্থনৈতিক খাতে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সামরিক খাতে চীনা উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনী টহল দিয়ে আগ্রাসী নীতি অবলম্বন করছে। আমেরিকা এমনটা করতে থাকলে চীনা নৌবাহিনীও ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে টহল দিতে থাকবে। নতুন নজরদারি প্রযুক্তির বদলে টহলদানের নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন করতে পারে তারা।

প্রশ্ন: আসিয়ান-ইন্ডিয়া সম্পর্কে ফেরা যাক। ভারত ২৫ বছর আগে যখন সংলাপ শুরু করেছিল, তখন আপনি ছিলেন অন্যতম ক‚টনীতিক। আপনি কি মনে করেন, এত বছর পর সম্পর্ক সেই মাত্রায় পৌঁছেছে?
কিশোর মাহবুবানি: প্রথমত আমি বলব, তখনকার সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী গোহ চক তং উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন চাপ ছিল, পাকিস্তানকে না নিয়ে কেবল ভারতকে নেওয়া যাবে না। আসিয়ান-ইন্ডিয়া পার্টনারশিপ যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো পর্যায়ে উপনীত হয়নি।

প্রশ্ন:  ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট আমলের এক বছর হয়ে গেছে। এই সময়ে এশিয়ার ওপর কী প্রভাব পড়েছে?
কিশোর মাহবুবানি: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ব্যাপক উদ্বেগ ছিল। তিনি চীনের মুদ্রা নিয়ে ফায়দা তোলার বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজেদের রক্ষার ভার গ্রহণ করতে হবে, তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করেছিলেন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র সবাই ছিল উদ্বেগে। তবে পরে দেখা যায়, এসব চিৎকার চেঁচামেচির পুরোপুরি ফাঁকা শব্দ। এর পর থেকে ট্রাম্পের নীতিতে অনেক ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, এমনকি উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেও। যুদ্ধ লাগেনি, যুক্তরাষ্ট্র এখনো আলোচনাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনার পরের বইয়ের নাম ‘হ্যাজ দি ওয়েস্ট লস্ট ইট?’ আমেরিকার পতন নিয়ে চিন্তার প্রতিফলন কি এতে ঘটেছে?
কিশোর মাহবুবানি: একেবারে চাঁচাছোলা ভাষায় বলা যায় না যে আমেরিকার পতন হচ্ছে। দেশটির জিএনপি এখনো বাড়ছে। তবে ১৯৬০-এর দশকে আমেরিকান জিএনপি ছিল বিশ্বের জিএনপির ৪০ ভাগ, এখন তা ক্রয়ক্ষমতার আলোকে নেমে এসেছে ১৫ ভাগে। ফলে দুনিয়া হয়ে পড়েছে পুরোটাই ভিন্ন। চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এখন দুই নম্বরে। অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভারতের নিচে তিন-এ নেমে আসবে। বিশ্ব সম্পর্কে ভাবনায় আমেরিকানদের সমস্যা হচ্ছে। তারা দ্বিতীয়স্থানে নিজেদের অবস্থানকে মেনে নিতে পারছে না।

প্রশ্ন: আপনি আসিয়ানকে বিস্ময় হিসেবে অভিহিত করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া কিভাবে একে অনুকরণ করতে পারে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে সার্ক দেশগুলো সম্মেলন পর্যন্ত করতে পারেনি।
কিশোর মাহবুবানি: আমি মনে করি আসিয়ান থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি গ্রহণ করা যায় তা হলো নিয়মিত বৈঠক করা হলে আস্থার পর্যায়ে ব্যবধান হ্রাসে ব্যাপক অগ্রগতি হাসিল করা সম্ভব। আমি ১৯৭১ সালে পাঁচটি দেশকে নিয়ে আসিয়ানের প্রথম সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম। তখন আস্থাহীনতা ছিল প্রবল মাত্রায়। ২০ বছর পরের বৈঠকগুলোতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায়। সার্কের উচিত আসিয়ানকে সচেতনভাবে সমীক্ষা করা, সব পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক করার অভ্যাস করা। সব ইস্যুতে আসিয়ানের বছরে হাজার খানেক বৈঠক হয়। স্বাস্থ্য, সংক্রমণ, মহামারি ইত্যাদি সব সমস্যা নিয়েই আলোচনা হয়। সার্ককে অবশ্যই অভিন্ন ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করতে হবে।

প্রশ্ন: ভারত বলছে, এই অঞ্চলের অভিন্ন সমস্যা সন্ত্রাসবাদের সমস্যা পাকিস্তান সুরাহা না করা পর্যন্ত সার্কের বৈঠক হতে পারে না। এর ঊর্ধ্বে কি ওঠা যায় না?
কিশোর মাহবুবানি: প্রথমেই এই প্রশ্নটি আসে। আসিয়ানে ফিলিপাইন দাবি করে সাবাহ দ্বীপ, মালয়েশিয়া বলছে, ফিলিপাইন এই দাবি থেকে সরে না আসা পর্যন্ত তারা এ নিয়ে আলোচনা করবে না। এখন প্রত্যেকে এটি ভুলে গেছে। আসিয়ানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার সাংস্কৃতিক বিচক্ষণতাবোধ। আমরা সমাধান চাই। অনেকে বলে, সামরিক শাসিত হওয়ায় মিয়ানমারকে নেওয়া যাবে না। সময়ের পরিক্রমায় এসব বদলে গেছে। ফলে আঞ্চলিক জোটের অংশ হতে তাদেরকে তাদের আচরণ বদলাতে হয়েছে।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com