শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮
আরসা ফিরে আসায় রোহিঙ্গা সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা
আফসান চৌধুরী
Published : Thursday, 11 January, 2018 at 5:43 PM

বাংলাদেশ যে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে প্রস্তুত ছিল না, অনিচ্ছা সত্বেও সেটা এখন স্বীকার করে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অনেকে হয়তো আশা করেছিলেন যে, সীমান্ত খোলা রাখলে সাথে কিছু সুবিধাও জুটে যেতে পারে, তবে সে রকম আশা পূরণ হয়নি। একইভাবে মিয়ানমারের পৃষ্ঠপোষক ও সমর্থক চীন আর ভারতও আশা করেনি যে, সমস্যাটা এতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল হবে। কারণ আস্তে আস্তে এই সমস্যাটা আঞ্চলিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলছে।

সঙ্কটের সময়কালটা বাংলাদেশের জন্য খুবই খারাপ হয়েছে, কারণ ২০১৮ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। একটা অভাবনীয় শরণার্থী সঙ্কটকে যখন মোকাবেলা করতে হচ্ছে, তখন এ অবস্থায় কোনো সরকারই একটা নির্বাচনের আয়োজন ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাইবে না। এর সঙ্গে রয়েছে এআরএসএ (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি)সহ রোহিঙ্গা মিলিশিয়াদের তৎপরতা, যারা এখনও বিলুপ্ত হয়নি এবং ৫ জানুয়ারি আরেকবার হামলা করেছে।

গেরিলা গ্রুপ হিসেবে এআরএসএ বড় কোনো শক্তি না হলেও পৃথিবীকে নিজেদের অস্তিত্ব জানানোর জন্য তারা হামলা করেছে। এতে কোনো বেসামরিক মানুষের প্রাণহানী হয়নি। এর অর্থ হলো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যাকারী চেহারার বিপরীতে এরা অনেকটাই “জনমুখী”। ধীরে ধীরে এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশও এ সঙ্কটে একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। কারণ বাংলাদেশ-মিয়ানমার উপকূলীয় এলাকায় অনেক ধরনের তৎপরতা শুরু হচ্ছে যেগুলো সবসময় সরকারী নজরদারি বা যাচাইয়ের আওতায় থাকছে না, সেগুলো নিয়ন্ত্রণের কথা না হয় বাদই দিলাম।

আরসা’র কি ইমেজ সঙ্কট নেই?

ঐতিহাসিকভাবে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা হলো পাচারকারীদের এলাকা এবং অন্তত গত ৭৫ বছর ধরে এ পথে মাদক পাচার হয়ে আসছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এলাকা থেকে এ পথে হেরোইনও পাচার হয়েছে। এখন এটা ইয়াবা পাচারের স্বর্গরাজ্য। এই বাণিজ্যের পরিমাণটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এবং এটার সঙ্গে যেহেতু ক্ষমতার উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ রয়েছে, তাই এটা বন্ধ করলে বহু মানুষই অখুশি হবে। এর অর্থ হলো গোপনে সীমান্ত পারাপার বন্ধ হবে না। যদি তাই হয়, তাহলে মিলিশিয়ারাও খুব সহজেই এখানে যাওয়া-আসা করবে। এই ধরনের যাতায়াত এতটাই সহজ যে জঙ্গি-বিরোধী অভিযানেও খুব একটা লাভ হবে না, যদিও এ রকম প্রচেষ্টাও ওই এলাকায় একেবারেই নেই।

এআরএসএ গেরিলাদের তৎপরতার কারণে ভারত খুবই চিন্তিত। এ বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আরও সোচ্চার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের উপর চাপ দিচ্ছে তারা। ভারতের উদ্বেগের কারণ হলো পাকিস্তান, যারা এর সুযোগ নিয়ে ভারতে ভেজাল করবে। তারা জানে, বাংলাদেশে যদি এ রকম জঙ্গিদের দমন না করা হয়, তাহলে এর শাখা-প্রশাখা গজাবে যা ভারত পর্যন্ত যাবে। তবে রোহিঙ্গাদের হিজরতের পেছনে এআরএসএ-কে দায়ী করার জন্য শুরুতে যে প্রচারণা হয়েছিল, সেটার ধার এখন আর নেই।

সমস্যা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা সহানুভ’তিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য সন্ত্রাসীদের শত্রুদের ভালো হতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার সারা বিশ্বেই নিন্দীত হয়েছে এবং এমনকি তাদের “শয়তান” উপাধীও জুটেছে। তাই দানব-বিরোধী ভাল মানুষ সাজার জন্য এআরএসএ-কে খুব বেশি কিছু করতে হয়নি।

বড়দের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বিভ্রান্তি?
ভারতীয় নীতি হচ্ছে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্য থেকে যে কোনো একটি দেশকে তারা বেছে নেবে না। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিশ্ব মিডিয়ায় গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের তথ্য-প্রমাণ দেখানো হলেও এই দুই দেশের সঙ্গেই “ভাইসুলভ” আচরণ করতে চায় তারা। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে ভারতের ভাবমূর্তি পণ্যের বাজারের অবস্থা নাজুক যাচ্ছে। তবে এখন এই পতন কিছুটা কমেছে, কারণ চীন মিয়ানমারের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় আবির্ভূত হওয়ার পর বাংলাদেশে চীনা ভাবমূর্তির পণ্যের চাহিদায় ভালোরকম নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

চীন যদিও একান্তে বলছে যে, মিয়ানমারের বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তারা হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু আঞ্চলিক পরাশক্তি হতে গেলে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রভাব বজায় রাখার জন্য কিছু প্রতিপত্তি খাটাতে হয় বৈ কি। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের যদি কোনো প্রভাব না থাকে, তাহলে স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী হিসেবে তার ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষুদ্র দেশগুলো চায় যে, চীন ওই ভূমিকা পালন করুক। কিন্তু এটা থেকে চীন হয় পিছু হটছে, নয় তো এ ভূমিকা পালনে তারা অক্ষম। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর চোখে তারা সেক্ষেত্রে ছোট হয়ে যাবে। কিন্তু ‘ওবিওআর’-এর উদ্যোক্তারা কখনই চাইবে না তাদের মর্যাদা রাষ্ট্রনায়কের অবস্থান থেকে বিক্রেতার পর্যায়ে নেমে যাক।

রোহিঙ্গা + আসাম = সকলের জন্য বড় উদ্বেগ?
অন্যদিকে, আসাম থেকে যে সাড়া-শব্দ ও খবর আসছে, তা বাংলাদেশের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে ভালো বিবেচনাতেও এটা একটা অস্বস্তি, আর খারাপ বিবেচনায় তো রীতিমতো হুমকি। আসাম থেকে পুশ-আউট করা হলে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। এটা যে তাৎক্ষণিকভাবে শুধু বাংলাদেশকেই আক্রান্ত করবে তা নয়, বরং প্রবাদের ভাষায় নরক গুলজার হয়ে যাবে। আর সেই পরিস্থিতি কারোরই সেভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে না।

এই অস্থিরতার আরেক উৎস হলো রোহিঙ্গাদের প্রতি স্থানীয়দের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ, কারণ তাদের আগমণে ওই এলাকার অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পরিস্থিতির দেখভালের দায়িত্ব সরকারের হলেও এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা পরিস্থিতি থেকে কিভাবে উদ্ধার মিলবে, সেটা কারোরই জানা নেই। এবং এই এলাকা- এখন যেটা বলতে গেলে আইনের আওতার বাইরে, সেখানে অস্থিতিশীল শক্তিগুলোর উপস্থিতি বাড়ছে।

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সংকটকে বাংলাদেশের ওপর মিয়ানমারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের পীড়ন হিসেবেই দেখছে দেশটির মানুষ। এর বিরুদ্ধে সামাজিক সমর্থনও বাড়ছে। এটা নিয়ে সবারই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। ১৬ মিলিয়নের বিশাল জনসংখ্যার একটি দেশের ঝামেলা ওই অঞ্চলে সবার জন্যই ঝামেলা। চীন, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমারের কথা বাদই দিলাম, কেউই চাইবে না এ এলাকায় একটা ঝামেলা ও বিপদ তৈরি হোক। সেরকম কিছু হলে সেটা বাকিদেরও স্পর্শ করবে। যদিও এদের কাউকেই দেখে মনে হচ্ছে না যে, এরকম আশঙ্কা তাদের ভেতরে আছে।

আমরাও সেরকমই আশা করবো। কিন্তু রোহিঙ্গা সঙ্কট দেখিয়ে দিয়েছে যে বাংলাদেশের মতো পরাশক্তিগুলোও অপ্রত্যাশিত অবস্থার মুখোমুখি হতে পারে। প্রস্তুতি ছাড়া পূর্বাভাস দেওয়াটা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ।

আফসান চৌধুরী: সাংবাদিক


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com