শনিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৮
বুকের বাসায় সে
মাসুম বিল্লাহ
Published : Thursday, 11 January, 2018 at 5:37 PM

এত দিন পর তমালের সঙ্গে দেখা হবে ভুলেও ভাবিনি। স্টেশনে একা বসে আছি। সে সময় ভিড়ের মধ্যে তমালকে দেখি। চোখ সরানোর আগেই ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল। যে মানুষ ট্রেনে চড়তে অপছন্দ করে তাকে রেল স্টেশনে দেখে একটু অবাক হই। ট্রেনের দুলুনি আর লম্বা সময়ের কারণে ট্রেন জার্নি তমালের ভালো লাগত না। কখনো ওর সঙ্গে ট্রেনে জার্নি করতে পারেনি। গো-ধরা স্বভাবের কারণে ওর  সঙ্গে বাসেই আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। এখন কেন তবে ট্রেনে চড়ছে? আমার মনের কথা হয়তো বুঝতে পেরে নিজেই বলল, সরকারের সঙ্গে বাস মালিক-শ্রমিকদের কী একটা ঝামেলায় অবরোধ ডেকেছে। অগ্যতা ট্রেনেরই শরণাপন্ন হতে হলো। তারপর নিজেই হাসতে লাগল। একবার ইচ্ছে করছিল বলি-ট্রেনে যেতে তোমার সমস্যা হবে না? বলা হলো না, তমাল ওর ব্যাগটি আমার পায়ের কাছে রেখে ব্যস্ততার সুরে বলল, আশপাশে ফার্মেসি আছে কিনা খুঁজে দেখি, এসিটিডি খুব ভোগাচ্ছে। এবেলা ওষুধ ফুরিয়েছে। তমাল আর দাঁড়ায় না। দ্রুত পায়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
    
    মিনিট দশেক পর তমাল ছুটে এল। হাঁফ ছেড়ে বলল, বাপ্ রে, দূর কম না!
    বয়স তো কম হলো না। আমি খোঁচা দিতে ছাড়লাম না।
    তা অবশ্য। তুমি কিছু মনে করোনি তো?
    কেন? অবাক হলাম তমালের কথায়।
    এই যে তোমাকে একা রেখে গেলাম।
    আমি কিন্তু একাই এখানে বসেছিলাম...!
    তোমার হাজবেন্ড কোথায়?
    আমি একাই এসেছিলাম- মায়ের শরীর আবার খারাপ করেছে।
    এখন কেমন আছেন?
    একটু ভালো।
    ও।-তমাল আর কিছু বলল না। 

আমি ভেতরে ভেতরে অবাক হচ্ছি- এতো বছর পর ওকে কত সহজে চিনতে পারলাম। চেহারার গড়ন পাল্টেছে। মুখে চর্বি জমেছে, পেটও অনেকটা বেড়েছে, দেখতে বিশ্রী লাগছে। সিগারেট ছেড়েছে কী ছাড়েনি বুঝতে পারছি না। এ পর্যন্ত যে মানুষটিকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে আসছি আজ তাকে সহজে চিনতে পারব? জানি কথাটা বোকার মতো হয়ে যাচ্ছে। তবুও। কেন ওর চোখে চোখ রেখেছি? চোখ পড়লেই কি চোখ রাখতে হবে? পথে চলতে কত মানুষের চোখেই তো চোখ পড়ে- তাই বলে হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকতে হবে? কেন আমি চোখ সরিয়ে নিজেকে আড়াল করলাম না? আমার কেন একটুও লজ্জা হলো না?...আমি কেন লজ্জা পাব? কেন নিজেকে আড়াল করব? আমি কোনো অন্যায় করিনি! তমালটাও কম বেহায়া না-কেমন সুড়সুড় করে সামনে এসে দাঁড়াল! মনে হচ্ছে, আমি যেন ওর জন্যই রেল স্টেশনে অপেক্ষা করছি। পুরুষ জাতই এমন হ্যাংলা। কিন্তু আমি কেন ওর সঙ্গে কথা বলতে গেলাম, না চেনার ভান করে থাকলেই হতো! 
   
বর্ণা!-তমালের ডাকে সংবিৎ ফেরে আমার। ইশ্ কতো ঢং- আবার ন্যাকামো ‘বর্ণা’ বলে ডাকা হচ্ছে! রাগে আমার শরীর জ্বলতে লাগল, ভদ্রতার মুখোশ পড়ে বলি, নামটা মনে রাখলে কী করে?
    মানুষের নাম কি সহজে ভোলা যায়?
    তোমার স্ত্রীকে দেখছি না? সুন্দরী, বড়লোক স্ত্রীকে একা রেখে চলাফেরা করা ঠিক হচ্ছে?
    তিন্নি বাসায় আছে, ওর সৌন্দর্য্য দিন দিন যে হারে বাড়ছে তাতে করে বাইরে ঠিকমতো চলতে ফিরতেই পারে না!-তমালের মুখে হাসি।
    মানে?
    ওজন বেড়েছে, সঙ্গে ডায়াবেটিস-নিয়মের বাইরে চললে যা হয় আর কি! 
    ও! ডাক্তার দেখাওনি?
    দেখাচ্ছি, কিন্তু কোনো ফল হবে বলে মনে হয় না। 
   
    কিছু বলার আগে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে থামল। যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। এরি মধ্যে তমাল আমার ব্যাগটি তুলে নিয়ে বলল-চলো। রাগ হলেও কিছু বলতে পারলাম না। তবে মনে মনে গাল দিতে ছাড়লাম না, পুরুষ মানুষ আসলেই বেহায়া। এগিয়ে গেলাম ভিড় ঠেলে। ট্রেনের সিঁড়ি দিয়ে আগে উঠে গেল তমাল। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-এসো। আমার দ্বিধায় হাত বাড়িয়ে দিলাম। এরপর তমাল যে কাণ্ডটি করল তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমার পাশের সিটের ভদ্রলোককে ম্যানেজ করে ফেলল। তমাল ভদ্রলোকটিকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার সাগরে ভাসিয়ে দিতে লাগল। ভদ্রলোক হাসিমুখে তার সিট ছেড়ে দিয়ে তমালের সিটে গিয়ে বসল।

    ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এসেছে। ভাবছি-তমালকে এতোটা প্রশ্রয় দেওয়া আমার  উচিত হয়নি। ধূর, কীসের প্রশ্রয়! ট্রেনে উঠার পর যদি তমালের সঙ্গে দেখা হতো, যদি আমার পাশের সিটটি ওর হতো, তখন? এটা নিয়ে এতোটা সিরিয়াস না হলেও চলবে। বরং এতদিন পর দেখা হয়ে ভালোই হয়েছে, একটা প্রশ্ন করার সুযোগ পাওয়া গেল। প্রশ্নটা মুখ ফুটে করেই ফেললাম-আমার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তুমি নানা অজুহাতে আমাদের বাড়িতে বেশ কয়েকবারই এসেছ-তোমার লজ্জা করতো না, তমাল?
    প্রশ্নটা আমি একটু জোরেই করে ফেলি। খেয়াল হয় সামনে পেছনের সিটে মানুষ বসে আছে। একটু যেন লজ্জা পেলাম। তবে তমালও যেন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল, বলল- বিশ্বাস করো, খুব লজ্জা করত। তবু যেতাম-আতিফকে দেখার জন্য। নিজের ছেলেকে দেখতে যেতে ইচ্ছে করবে না? শুধু কি আতিফকে দেখতে যেতে?-প্রশ্নটা করতে ছাড়লাম না।
    শুধু আতিফকে দেখার জন্য যেতাম তা নয়, তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করত খুব, কিন্তু তুমি তো আমার সামনেই কখনো পড়নি। আমি তখন চোখ বন্ধ করে তোমাকে দেখতাম...
    মানে? তোমার সাহস তো মন্দ নয় দেখছি!-তমালকে থামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠি। আমার চারপাশের কথা খেয়াল হলে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলি, বাজে চিন্তা করা ছাড়া তোমার কোনো যোগ্যতা আগেও যেমন ছিল না। এখনো দেখছি সে স্বভাব যায়নি।
    প্লিজ বর্ণা আমাকে সব কথা বলতে দাও, তারপর তুমি বোলো... আমাকে নোংরা ভাবতে পারো, তবুও বলতে চাই-আমি চোখ বন্ধ করে পুরো তোমাকে দেখার চেষ্টা করতাম-তোমার বুকের ওপর কালো তিলটা,  তোমার  হাঁটুর নিচের কাটা দাগ-সব-মনে মনে বলতাম, বর্ণাকে শুধু আমি একা দেখব, দ্বিতীয় আর কেউ কখনো দেখতে পারে না, দেখবে না, আমি বর্ণাকে ছুঁয়েছি, ওর শরীরে আমার স্পর্শ, আর কেউ কখনো ওকে স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু একদিন শুনলাম তোমার বিয়ে হয়েছে। কষ্ট পেলাম খুব। আবারো ছুটে গেলাম, অবশ্য খবর পেয়েছিলাম তুমি তখন একা এসেছিলে। তোমাদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তা যত এগিয়ে আসছিল ততো মনে হয়েছিল-আরেকটু পর তোমাকে দেখতে পাব, ছুঁতে পারব, পরক্ষণে হুঁশ ফেরে...সবই আমার দিবাস্বপ্ন। তোমাদের বাড়ি এলাম। তুমি লুকিয়ে থাকলে ঘরে। এতোদূর থেকে এসে, তোমার এতো কাছে থেকেও তোমাকে দেখতে পাব না, ছুঁতে পারব না-ভাবতেই কান্না পাচ্ছিল। কীভাবে যে ফিরে এসেছিলাম তুমি বুঝবে না!
    বুঝতে পারছি বয়স বাড়লেও বদমাইশি যায়নি।
    তুমি যা বলো...
    তোমার বউকে এসব কথা কখনো বলেছ?
    না বলিনি। সংসারে অশান্তি হোক, আবার সংসার ভেঙে যাক, চাইনি।
    খুব ভালো।
    আচ্ছা বর্ণা, তোমার কখনো আমার কথা মনে পড়েনি, আমার মতো?
    না।
    মিথ্যে করে ‘না’ বললাম। চারপাশে এতো মানুষের মধ্যে- এসব কথা বলতে ইচ্ছে করল না। তাছাড়া বয়সটার কথাও ভুলে গেলে চলে না। তমালের কাছে নিজেকে ছোট করতে মন সায় দিল না। আমার যখন জাকিরের সঙ্গে বিয়ে হলো- বিয়ের প্রথম রাতে এমন একটা আচরণ করলাম অজান্তে নিজের কাছেই হাস্যকর লেগেছিল। জাকির কি ভেবেছে না ভেবেছে কখনো জানতে চায়নি। জাকির অবশ্য এসব সস্তা বিষয় নিয়ে মোটেও ভাবে না।
    ...হঠাৎ কানের কাছে তমাল ফিসফিস করে বলল, একটা কথা বলব?
    এতক্ষণ তো অনেক কথাই বললে, ভণিতা না-করে বলে ফেলো।-মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম আমি।
    আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ তুমি?
    পেরেছি।
    সত্যি?
    মিথ্যা বললে আমার বয়স কমে যাবে?
     
    আমার এ কথায় তমাল শব্দ করে হেসে ফেলল। এরপর আমরা দুজন আর কথা খুঁজে পেলাম না। আমাদের কথা আর এগোল না, মনে হলো সব কথা ফুরিয়ে গেছে, আর কিছু বলার নেই।
   
    চুপ করে থাকতে থাকতে একসময় দুজনের চোখেই ঘুম নেমে এলো। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানি না। তবে প্রথম ঘুম ভাঙে আমার। চোখ মেলে যা দেখি তার জন্য আমার চোখ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তমালের ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার একটা হাত তমালের হাত আঁকড়ে ধরে আছে।
   
    অদ্ভুত তো!


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com