শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮
কার বোতাম কত বড়ো, সেটাই এখন সমস্যা!
শুভময় মৈত্র
Published : Wednesday, 10 January, 2018 at 8:20 PM

হ্যাঁ সত্যি, ঠিক শুনেছেন। একটু চলতি বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘তোর চেয়ে আমারটা বড়ো’। তবে হঠাৎ করে মার্কিন রাষ্ট্রপতির গোটা একটা টুইটার বক্তব্যের মধ্যে থেকে কিছুটা কেটে নিলে তো চলবে না। সে ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার রং হলুদ হয়ে যাবে। অবশ্য ট্রাম্প রাজত্বে আমাদের বিমূর্ত চেতনায় চিরন্তন ন্যাবার রং লেপে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই কথা না বাড়িয়ে আগে পুরো বক্তব্যটার যতটা সম্ভব ভদ্র এবং আক্ষরিক বঙ্গানুবাদ করা যাক। মার্কিন দেশের সময় অনুসারে বিকেল ৪টা ৪৯মিনিট, ২ জানুয়ারি, ২০১৮। ট্রাম্পের বক্তব্য ‘উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এইমাত্র বলেছেন যে পারমাণবিক অস্ত্রের বোতাম তার টেবিলে সব সময় রাখা থাকে। তার বিপর্যস্ত ক্ষুধার রাজ্যের কোনো নাগরিক কি তাকে একটু জানাবেন যে আমার কাছেও পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের বোতাম আছে, যেটা তার তুলনায় অনেক বড়ো এবং শক্তিশালী। আর আমারটা কাজ করে’। 

দেখুন তো গুছিয়ে বাংলা করলে ট্রাম্পের বক্তব্যটা কী রকম ঝকঝকে শোনায়। সেখানে কিনা দেশ বিদেশ জুড়ে তার ঐতিহাসিক হুমকির ল্যাজামুড়ো কেটে নিন্দুকেরা প্রচার করছে ট্রাম্প নাকি কিমকে বলেছেন ‘তোর চেয়ে আমারটা বড়ো’। যখন এই লেখা লিখছি, সেই সময় দেখলাম টুইটারে ট্রাম্পের ফলোয়ার সাড়ে চার কোটির বেশি। আর এই মন্তব্যটায় জবাব দিয়েছে এক লক্ষ চুয়ান্ন হাজার মানুষ, রিটুইট করেছে এক লক্ষ পঁচাশি হাজার আর ভালো লেগেছে বলে জানিয়েছে চার লক্ষ আটষট্টি হাজার। এই ছোট্টো মন্তব্যটি অনেকের মনে বেশ দাগ কেটেছে, যার অকাট্য প্রমাণ এই সব সংখ্যা। 

ঠিক এই টুইটের আগে এবং পরেও দিন কয়েক ধরে সত্যিকারের ডোনাল্ড ট্রাম্প (টুইটারে ওনার নাম রিয়েলডোনাল্ডট্রাম্প ) অনেক টুকটাক মন্তব্য করেছেন। কিন্ত্ত এই বিমূঢ় আস্ফালনের প্রতিক্রিয়ায় যে রকম আলোড়ন উঠেছে, সেগুলোতে তত বেশি রিপ্লাই, রিটুইট বা লাইক জোটেনি। 
পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্র চালানোর জন্যে ভালো বোতাম থাকা অবশ্যই জরুরি। জেমস বন্ডের রোমাঞ্চকর ছায়াছবি যারা দেখেছেন তারা জানেন এই সব বোতাম ঠিক কিভাবে টিপতে হয়। তবে সে দিকে আমরা বিশেষ নজর দিই না। অর্থাৎ শুধু জেমস বন্ড কেন, অন্যান্য সিনেমা দেখে অথবা লেখা পড়েও আমাদের মনে বোতামের আকার এবং আয়তন নিয়ে বিশেষ প্রশ্ন জাগে না। বোতাম বা বোতাম টেপার গুরুত্ব সাধারণত মূল গল্পের গোপন চক্রান্তে হারিয়ে যায়। 

তাই বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে বোতামের আকার যে আলাদা হবে এবং সেটা যে পরাক্রম প্রকাশের একটা রাস্তা, তা কিন্তু আমরা সাধারণ ভাবে আগে কখনও ভাবিনি। তবে এই টুইটের পর পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের থেকেও অনেক বেশি ব্যঞ্জনা নিয়ে এসেছে তার চালিকাশক্তি বোতাম। মানব অ -সভ্যতার ইতিহাসে জনগণের ঘাড়ে পারমাণবিক বোমা ফেলার ঘটনা তো একটাই। তবে হিরোশিমা বা নাগাসাকিতে সম্ভবত বোতাম টিপে বোম ফেলা হয়নি। হয়তো যুদ্ধবিমানের নীচের কোনও দরজা ফাঁক করে সেখান দিয়ে জিনিসগুলো টপকানো হয়েছিল। অবশ্য বিমানের পেটের দরজা খোলার জন্যে বোতাম টেপা হয়েছিল, নাকি হাত দিয়ে হুড়কো সরানো হয়েছিল সে খবর জনগণের কাছে নেই। 

গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে এবার সরাসরি বোতামের কথায় আসা যাক। ট্রাম্প সাহেব যে পরমাণু অস্ত্রের বোতামের কথা বলেছেন তার আকৃতি বর্ণনা করতে গেলে দু’টি মাপের প্রয়োজন। একটি হলো বোতামের ব্যাসার্ধ আর অন্যটি হলো বোতামের উচ্চতা। ট্রাম্প এবং কিমের ক্ষেত্রে উচ্চতা আর ব্যাসার্ধ অনেকেই জানেন। উচ্চতায় ট্রাম্প এগিয়ে আর ব্যাসার্ধয় কিম। তবে এর পরেও যদি কেউ গোঁ ধরে থাকেন যে ট্রাম্প বা কিমের নয়, তাদের পারমাণবিক অস্ত্র প্রক্ষেপণের বোতামের মাপ বলতেই হবে, তা হলে অকপটে জানিয়ে রাখা ভালো যে এ রকম কোনো বোতাম সত্যি সত্যি নেই। গোটাটাই গল্প। ‘বোতামের ওপর আঙুল’ এই শব্দবন্ধ সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে শুরু। 

সাধারণত কোনো যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার চালক বিশেষ বোতাম টেপে। তৎক্ষণাৎ প্যারাসুট সহযোগে নিষ্ক্রমণের সুবিধা হয়। বিমান গোঁত্তা খেয়ে কার বাড়ির ছাদে গিয়ে ডিগবাজি খাবে জানা না থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে চালকের প্রাণটা বাঁচে। তবে তারপর থেকে দেশে বিদেশে এই কথার অর্থ বিস্তৃতি পেয়েছে বিভিন্ন সময়ে। যার নাকি সত্যিকারের অসীম ক্ষমতা, সে বোতাম টিপলেই কাজ হয়ে যায় নিমেষের মধ্যে। এ অভিজ্ঞতা আমাদের প্রত্যেকেরই আছে। পাড়ার বড়ভাই থেকে সরকারি অফিসের কর্মকর্তা, অঞ্চলের কাউন্সিলর থেকে মন্ত্রী, এদের কাছেই তো সেই বোতামগুলো থাকে, যার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয় আমাদের। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি পর্যায়ে বোতামের জোর অবিশ্বাস্য। এক ছোঁয়ায় নোট বাতিল থেকে ভারতের সমস্ত জনগণের তথ্য যাকে তাকে দিয়ে দেওয়া, যেমন খুশি ট্যাক্স চাপানো থেকে ব্যাঙ্কের টাকা হেলায় হাপিশ করে দেওয়া বোতাম সর্বশক্তিমান।  
তাই আজকের দিনে পারমাণবিক অস্ত্রের ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়ামের থেকেও তার বোতামের তাৎপর্য অনেক বেশি। বাস্তবে অবশ্য নাকের ডগায় প্রোটন -নিউট্রন ভরা ক্ষেপণাস্ত্র লেলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা মার্কিন দেশে বোতাম টেপায় সম্পন্ন হয় না। এই রকম পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র আকাশে ছাড়তে গেলে সে দেশের রাষ্ট্রপতিকে প্রথমে নিজের পরিচয়ের প্রমাণ দিতে হবে যন্ত্রের কাছে। এর পর আসবে গোপন সংকেত দিয়ে সেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের অনুমোদনের প্রশ্ন। রাষ্ট্রপতি যেখানেই যান না কেন, তার সঙ্গে থাকে পাঁচজনের বিশেষ দল, যারা এই সংক্রান্ত একটি কুড়ি কিলোর বাক্স নিয়ে ঘোরেন। বাক্সটাকে বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’। চৌকো বাক্সকে গোল বলার কারণটা ঠিক জানা নেই, তবে এর মধ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্র এবং তার সম্পর্কিত বিভিন্ন নির্দেশ রাখা থাকে। বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, মার্কিন সেনাবাহিনী নাকি এ দুনিয়ার কমবেশি এক হাজার জায়গায় পারমাণবিক বোমা ফেলতে পারে। অর্থাৎ আজকের দিনে বোম মারতে গেলে ট্রাম্পকে ঠিক করতে হবে কোথায় কোথায় টিপ করবেন। আশার কথা এই যে আপাতত তার নজর উত্তর কোরিয়ার দিকে। সে দেশের ঠিক কতগুলো জায়গা এই তালিকায় আছে তার বিশদ বিবরণ নিশ্চয় ভগবান জানেন। গোলা ছোড়ার আগে সঠিক সংকেত দেওয়ার জন্যে থাকে একটা কার্ড, যাকে ডাকা হয় ‘বিস্কুট’ বলে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য আকারে কোনো গোলমাল নেই, কারণ বিস্কুট আর কার্ড দুটোই সাধারণত আয়তক্ষেত্রের মতো হয়। অর্থাৎ ট্রাম্পের আঙুলের ডগায় বোতাম নয়, হাতে থাকবে বিস্কুট। কিমের ক্ষেত্রেও খুব অন্যথা হবে না। তবে ট্রাম্পের টুইট অনুসারে সেখানে সব কিছুই রাখা থাকবে কিমের টেবিলের ওপর। হাত বাড়ালেই বন্ধু। 

আমরা তো আর দেশনেতা নই। তাই এত কিছু শেখার পর আমাদের টেবিলে থাকবে সাদা খাতা আর আঙুলের ডগায় কবিতা লেখার পেন্সিল। হলুদ ধোঁয়া যখন হালকা হবে, তখন দেখব বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে গেছে, সেতুগুলো ভাঙা। লাশে ভরা একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে গেছে ইস্টিশনের ঠিক আগে। রাস্তায় উলঙ্গ মানুষের সারি। কেউ কাঁদছে না। শুধু গোঙাচ্ছে। গায়ের চামড়াগুলো আলগা হয়ে ঝুলে আছে চাদরের মতো। বুকের ওপর হাত দিয়ে ধরে রাখতে হচ্ছে ফুসফুস আর হূৎপিণ্ড। কারুর ঘিলু সামান্য বেরিয়ে এসেছে কপালের ফাটা জায়গাটা দিয়ে। পোড়া কাপড়ে ঢাকা আধঝলসানো নিতম্ব। টোগে সানকিচির কবিতার কিছু পঙক্তির ভাবানুবাদ। ইংরেজির পথ ঘুরে। ঠিক যেমন ট্রাম্পের টুইট অনুবাদিত হয়েছে এই লেখার শুরুতে। 

টোগে প্রত্যক্ষ করেছেন হিরোশিমা। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে মারা যান, ১৯৫৩ সালে। তুলনায় অনেক বেশি দিন বেঁচেছিলেন সাদাকো কুরিহারা, তার প্রয়াণ ২০০৫ সালে। তার কবিতায় উঠে এসেছে ঠিক বিস্ফোরণের সময় এক নারীর প্রসববেদনার কথা। কাছাকাছিই ছিলেন ঝলসে যাওয়া এক অচেনা দাই। 

অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি জন্মাতে সাহায্য করেছিলেন নতুন শিশুকে। এই কবিতাগুলোই আমাদের বার বার করুণা করতে শেখায় ট্রাম্প কিংবা কিমকে। ওনারা এখন প্রাথমিক স্তরের বাচ্চা ছেলেদের মতো ঝগড়া করছেন। ইস্কুলে ফিরে গেলে এই সব কবিতাগুলো অন্তত পড়ার সুযোগ পাবেন। আর কোনো ভাবে যদি অনেকবার ফেল করার পরে ওনাদের একই ক্লাসে দেখা হয়, তা হলে নিজেরাই সরাসরি নিজেদের বোতামের মাপ মিলিয়ে নিতে পারবেন। টুইটারে লোক জানাজানি হবে না। 

শুভময় মৈত্র: শিক্ষক, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা 





সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com