শনিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৮
বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা
নূরুজ্জামান মামুন
Published : Wednesday, 10 January, 2018 at 5:59 PM, Update: 10.01.2018 6:59:12 PM

অবশেষে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগ কমাতে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এ উদ্যোগ নিয়েছেন। আগামী ১ ও ৫ ফেব্রুয়ারি যথাক্রমে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন রাষ্ট্রপতি। বৈঠক থেকেই আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে মেডিকেলের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে নির্দেশ দিবেন। একই সঙ্গে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লাঘাম টেনে ধরবেন সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্র জানায়, গত ৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠির অনুলিপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসেনকেও দেওয়া হয়েছে। 

চিঠিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি আগামী ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে এবং ৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকটি হবে বঙ্গভবনে । 

বৈঠকের কর্মপরিধি চূড়ান্ত করতে আজ মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পরই কাজ শুরু করেছে ইউজিসি। তারা এরই মধ্যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে চিঠি দিয়েছেন।   

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান আজকালের খবরকে বলেন, ‘একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। তবে মূল বিষয় হবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে মহামান্য এই উদ্যোগ নিয়েছেন। গত দুই বছর ধরে মহামান্য আমাকে বললেও উপাচার্যরা আমার কথা শুনেননি। এ বছর স্যারকে বলেছি আপনি বললে সবাই শুনতে বাধ্য। এরইমধ্যে  বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে একমত হয়েছেন।’

অধ্যাপক মান্নান আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ৯৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সবাই সমানভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন না। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও বোর্ড মিটিং নিয়মিত করেন না। আয়-ব্যয়ের নিয়মিত অডিট করান না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা অনিয়ম সঙ্গে নানা ধরনের সমস্যাও আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোকে আইন মানতে বাধ্য করা, স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষাকার্যক্রম চালু, শিক্ষার গুনগতমান রক্ষা, একাডেমিক প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা হবে। 

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) এর চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব ইউজিসি চেয়ারম্যানকে বলেন, আপনারা তিনজন কখনই একত্রিত হতে পারেন না। আজ একত্রিত হয়েছেন, এখনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। ইউজিসি চেয়ারম্যান শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলে তিনিও সম্মত হন। পরে তারা (মন্ত্রী ও ইউজিসি চেয়ারম্যান) দুজনে মিলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলাপ করেন। পরে রাষ্ট্রপতি বৈঠকের দিন ও সময় জানিয়ে দেন।  

বর্তমানে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটতে হয়। এমনও হয়েছে সময় মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দিনে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করে। এমনকি সকালে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে বিকালে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। টানা দেড়-দুই মাস ধরে শিক্ষার্থীদের ভর্তিযুদ্ধের এক দুঃসহ লড়াইয়ে নামতে হয়। পেরেশানে থাকেন অভিভাবকরা। আর অতিরিক্ত অর্থব্যয়ের বিষয়টি তো রয়েছেই।

মেডিকেলের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা না নেওয়ায় একটি আসনের বিপরীতে শতাধিক শিক্ষার্থীকে লড়াই করতে হয়। প্রতিযোগিতায় টিকতে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে পুঁজি করে প্রতিবছর অর্ধ কোটি টাকা কোচিং সেন্টারগুলোর হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।


শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-সচিব বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষার আয়োজন করা হলে আসন প্রতি প্রতিযোগীর সংখ্যা ১০ জনের নিচে নেমে আসবে। অভিভাবকদের হয়রানী ও অর্থ খরচ কমে যাবে। কোচিং বাণিজ্যও নিরুৎসাহিত হবে।

সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে উপাচার্যদের বিরোধিতার কারণে বাস্তবায়ন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেরা সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। সিলেটে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তা ভেস্তে যায়। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ফের কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোগ দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বয়িত্বশাসিত হওয়ায় ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরোধিতায় তখনও বাস্তবায়ন করা যায়নি। 


অভিযোগ রয়েছে, সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষায় উপচার্যদের অনাগ্রহের নেপথ্যে রয়েছে ভর্তি ফরম ব্যাণিজ্য। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফরম বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করে। ফরম বিক্রির ৪০ ভাগ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তা মানে না। শিক্ষকরা সম্মানিবাবদ ভাগভাটোয়ারা করে নেন। 

ইউজিসি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদের কাছে দেওয়া হয়। এ সময়ে তিনি শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। পরে ইউজিসি চেয়ারম্যান এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। মন্ত্রণালয় উপাচার্যদের নিয়ে সভা করার তারিখ নির্ধারণ করলেও তা আর হয়নি। ২০১৭ সালের ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সুপারিশ করা হয়। গত ১১ ডিসেম্বর ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে দেন। এসময়ে রাষ্ট্রপতি ফের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।  

২০১৬ সালের ১২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজশাহীর আট জেলার মানুষের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন। এ সময়ে জয়পুরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খাতুন প্রধানমন্ত্রীকে মেডিকেলের ভর্তির মতো সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়ার অনুরোধ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী ভর্তি পরীক্ষার জটিলতা দূর করতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, অনলাইনে যদি আমরা ঘরে বসে কেনাকাটা করতে পারি, তাহলে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারব না? আমরা ভবিষ্যতে সব ভর্তি পরীক্ষাই অনলাইনে করার ব্যবস্থা করব।

আজকালের খবর/এসএ






সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com