শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮
বাধা অতিক্রম করেই সামনে এগুচ্ছি: আইভী
Published : Monday, 8 January, 2018 at 10:04 PM, Update: 08.01.2018 10:10:46 PM

সেলিনা হায়াৎ আইভী। চিকিৎসক থেকে জনপ্রিয় রাজনীতিক। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র হলেও তার পরিচিতি দেশজুড়ে। দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে তিনি প্রথম ও একমাত্র নারী মেয়র। গত বছর সরকার তাকে উপমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে প্রথম সিটি করপোরেশেন নির্বাচনে শামীম ওসমানকে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হারান। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর হওয়া প্রথম দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীকেও প্রায় লাখখানেক ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে নগরের দায়িত্ব পান। 

মেয়র আইভীর দেশব্যাপী পরিচিতি থাকলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান ও জনপ্রিয়তার বড় একটি ভিত্তি হলো আলী আহম্মদ চুনকার মেয়ে তিনি। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগকে যারা প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদের অন্যতম ছিলেন আইভীর পিতা। আইভী নিজেও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। গত বছরের ৯ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো নারায়ণগঞ্জ নগরের দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছিলেন তিনি। সন্ত্রাস ও হত্যার বিভীষিকা থেকে নারায়ণগঞ্জকে বের করে উন্নয়নের পথে চলছেন। তৃতীয়বারের প্রথম বছরটি কেমন গেল তাই নিয়ে মুখোমুখি হয়েছিল আজকালের খবর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাহরাম খান ও মামুন মিয়া।

আজকালের খবর: প্রথম বছরটা কেমন গেল?
সেলিনা হায়াৎ আইভী:  দেখতে দেখতেই এক বছর চলে গেছে। অনেক কাজই করতে চেয়েছি। সব তো আর পারিনি। তারপরও বেশ কিছু কাজ এগিয়েছে। কিছু কাজে প্রত্যাশিত অগ্রগত না হলেও চলছে, আশা করি শেষ করতে পারব। বিশেষ করে ঢাকার হাতিরঝিলের আদলে নারায়ণগঞ্জের জিমখানা লেকের কাজ অনেকটা এগিয়েছে। খুব সুন্দর একটা কাজ হচ্ছে। আশা করি নগরবাসী পছন্দ করবেন। এ পর্যন্ত ৫০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়ে গেছে। এটা শহরের মধ্যে অন্যতম দৃশ্যমান কাজ। এই প্রকল্পটা অনেক বড়। বেশ কিছু মামলা ছিল। এগুলো মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাই সময় বেশি লাগছে।
নগর ভবনেও কাজ চলছে। নয়তলার মধ্যে পাঁচ তলা পর্যন্ত টেন্ডার হয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এটি একটি আধুনিক ভবন হবে। সব ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকবে। অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে ভবনের কাজটি এগুচ্ছে ধীরে। আমি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরের মধ্যে জিমখানা লেক এবং মেয়র অফিস সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রকল্পগুলো এখনো শেষ হয়নি। তবে, শেষ না হলেও আমার অসন্তুষ্টি নেই। কারণ খুব ভালোভাবে কাজ হচ্ছে। ভালো কাজে একটু দেরি হলে আপত্তি নেই। দুটি কাজই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে।

আজকালের খবর: আপনার পিতার নামে একটি আধুনিক পাঠগার নির্মাণ হচ্ছে শহরে।
সেলিনা হায়াৎ আইভী: হ্যাঁ। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হওয়ার আগে যখন পৌরসভা ছিল তখনই এই কাজটির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শহরে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই হবে না। আমরা চাই শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের পড়াশোনার ভালো একটি পরিবেশ সব শহরে থাকা উচিত। লাইব্রেরির কাজ প্রায় শেষ। এটা নিয়েও মামলা ছিল। তাই কাজ শেষ হতে অনেক বেশি সময় লেগেছে।

আজকালের খবর: একদিকে সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ, অন্যদিকে কিছু মানুষ জায়গা দখল করে রেখেছে। আবার মামলাও করছে। এসব কীভাবে সামলাচ্ছেন?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে অনেক মানুষের সহযোগিতা পাচ্ছি এটাও ঠিক। সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়েই আমি জনপ্রতিনিধি হয়েছি, তাদের সহযোগিতা নিয়েই সব উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করি। অনেক মানুষ নিজে এগিয়ে এসে সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কাজে সহযোগিতা করেন। যেগুলোতে মামলা হচ্ছে সেগুলো আইনিভাবে মোকাবিলা করছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বুঝানো চেষ্টা করছি। তাতেও মানুষ সাড়া দিচ্ছেন। এরপরও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তো আছেই। সমস্যা মোকাবিলা করেই সামনে এগুতে চেষ্টা করছি। 

আজকালের খবর: এবার দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: খোলা মাঠ এবং বিদ্যমান জলাশয়গুলো রক্ষায় বিশেষ নজর দিচ্ছি। আমরা চেষ্টা করছি প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে যেন অন্তত ভালো একটি খেলার মাঠ থাকে। শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের গড়ে উঠতে ভালো পরিবেশ দিতে না পারলে উঁচু উঁচু  ভবন আর রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করে লাভ হবে না। প্রতিটি ওয়ার্ডে না পারলে দুই-তিনটি ওয়ার্ড মিলিয়ে যেন একটি মাঠ থাকে সেই চেষ্টা করছি।
এ ছাড়া শহরের জলাশয় রক্ষায় আমাদের বিশেষ অগ্রাধিকার রয়েছে। ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি খালের উন্নয়ন কাজ চলছে। খালটি বাবুরাইল হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে পড়বে। খাল উন্নয়নে আরও কয়েকটি প্রকল্পের টেন্ডার আগামী সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে হবে আশা করি। এ ছাড়া আদমজীর সামনে যে লেক আছে সেটারও উন্নয়ন কাজের টেন্ডার হবে আগামী সপ্তাহে। এটার পাড় বাঁধানো রাস্তার কাজ করা আছে। এর সঙ্গে বিনোদনের কিছু বিষয় যোগ করে দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। জাইকার অর্থায়নে এই কাজটা হবে।

আজকালের খবর:  দেখা যাচ্ছে খাল রক্ষা এবং মাঠের দিকে নজর বেশি দিচ্ছেন।
সেলিনা হায়াৎ আইভী: তা দিচ্ছি। তবে রাস্তা-ঘাট ও ড্রেনের কাজ আমাদের প্রতিনিয়তই করতে হয়। এসব রুটিন কাজের বাইরে মাঠ ও খাল রক্ষা এবং সেগুলোতে মানুষ গিয়ে যেন আনন্দ পায় সেই চেষ্টা করছি।

আজকালের খবর: ২০১১ সালের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র হয়েছিলেন। ২০১৬ দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো পার্থক্য?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমার কাছে কোনো পার্থক্য মনে হয় না। আমি যখন থেকে নির্বাচন করি তখন যেভাবে আমাকে সবাই ভোট দিয়েছেন এবারও দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সময় জনমানুষের ভালোবাসা ও ভোট দুটোই পেয়েছি। আমার মনে হয় জনগণও আমার কাছ থেকে ব্যতিক্রম কোনো আচরণ পাচ্ছেন না। আমি আগের মতোই কাজ করছি। 

আজকালের খবর: সরকারের সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: সরকারের সহযোগিতা পাচ্ছি প্রচুর। সরকারি অর্থায়নে ১৯১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান আছে। ১৮২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প সম্প্রতি পাস হয়েছে। ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছি। এই খাতে বড় একটি প্রকল্প দেওয়া ভালো কাজ করতে পারব বলে মনে হয়। আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হবে শিগগিরই। আরও পাঁচশ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান আছে। তাই বলব যেমন সহযোগিতা আশা করি সরকারও তেমনভাবে সাড়া দিচ্ছে।

আজকালের খবর: জিমখানা প্রকল্প নিয়ে অনেক বাধা এসেছে বলে শুনেছি। 
সেলিনা হায়াৎ আইভী: কাজ করতে গেলে তো সমস্যা কিছু আসবেই। আমি ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান ও জলাধার সংরক্ষণ আইনকে সামনে নিয়ে কাজ করছি। সমস্যায় আটকে গেলে হবে না। সমস্যাকে মোকাবিলা করার শক্তি আমার জনগণের দোয়া ও ভালোবাসা। এ ছাড়া মানুষের জন্যই তো কাজ করছি। আমার নিজের বাড়ি কিংবা পরিবারের উন্নয়নের জন্য কিছু করছি না। বাধা আসবেই। গত ১৪ বছর জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। বাধা ছাড়া তো কোনো কাজ করতে পারিনি। বাধা অতিক্রম করেই তো কাজ করছি।

আজকালের খবর: আপনি জেলা আওয়ামী লীগেরও নেতা। রাজনীতি কেমন চলছে?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমি কোনো নেতা না। আমি শেখ হাসিনার একজন কর্মী। কর্মী হয়েই থাকতে চাই। নেতাগিরি আমাকে দিয়ে হয় না, করতেও চাই না। মানুষের সঙ্গে আছি, থাকব। কর্মী হিসেবেই দলের জন্য কাজ করতে চাই। সারাদিন মানুষের জন্যই কাজ করি। এটাই দলের জন্য কাজ।

আজকালের খবর: প্রতিশ্রুতি কী দিয়েছিলেন, কতটুকু পূরণ করতে পেরেছেন বা পারবেন?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: আহামরি কোনো প্রতিশ্রুতি আমি দেই না। কারণ আমি জানি নারায়ণগঞ্জের মানুষের কী দরকার আর আমার কতটুকু সামর্থ্য আছে। শহরের যানজট, ফুটপাতে হকারসহ বিভিন্ন বিষয় আছে যার সব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হয়। এ কারণে কিছু অসঙ্গতির শিকার হতে হয় নগরবাসীকে।

আজকালের খবর: সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে সিটি গর্ভর্নমেন্ট চালুর দাবি অনেক দিনের। সেটা কী হবে মনে হয়?
সেলিনা হায়াৎ আইভী: তা তো হতেই হবে। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সবকিছু চাইলে রাতারাতি হয়ে যাবে না। আপাতত অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মেয়রের সঙ্গে তিন মাস অন্তর বৈঠক করে কাজ করছে। আশা করি ধীরে ধীরে সব সেবা প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনের অধীনেই চলে আসবে। আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। তাই স্থানীয় সরকারের আরও ক্ষমতায়নের দিকেই এগুতে হবে। না হয় লক্ষ্যপূরণ কঠিন হয়ে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশকে একটি পর্যায়ে নিতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। তার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শহর সরকার বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের চাহিদা অনেক। কাজ করলেই তো চাহিদা বাড়ে। আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি।

আজকালের খবর/এসএ




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮।  বিজ্ঞাপন- ০১৯৭২৫৭০৪০৫, ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সাকুলের্শন- ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com