শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
দিন যায়, রাত আসে
ঊষার মাহমুদ
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 5:57 PM

বাবার বড় ছেলে আমি। শৈশব থেকে দায়িত্ববোধের মধ্যদিয়ে বেড়ে ওঠা । বুঝ হওয়ার পর থেকেই বাবার অসুস্থতা আর সংসারের নড়বড়ে অবস্থা আমাকে ভাবিয়ে তুলতো। গায়ে ইস্ত্রি করা জামা আর হাতে ঘুড়ি পরে ঘুরে বেড়ালেও মনে মনজুড়ে হামাগুড়ি দিতো মেঘ। মধ্যবিত্ত শব্দটার অপর নাম বোবাকান্না।

দাদার একমাত্র সন্তান আমার বাবা। দাদার রেখে যাওয়া জমিজমা বিক্রি করে এটাসেটা করা হতো। ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে সফলতা। বাবা বুঝতে না দিলেও আমি তার নীরবতায় টের পেতাম। বাবা প্রায় রাতেই কাঁদতেন।
 
আমার চারটি বোন। আমি বড়। একসময় বুঝতে পারলাম, পড়াশোনা করে শেষ অবধি যেতে গেলে সংসারটা আটকে যাবে। এই স্বপ্ন দেখাটা অন্তত আমার জন্য ভুল ছাড়া কিছুই না। বাবা-মা দুইজন কৌশল করে সংসার চালাতেন। আমাদের সংসারের দারিদ্র কখনোই প্রতিবেশীদের বুঝতে দিতেন না।  একসম বাবা-মাকে বুঝিয়ে রাজি করাই, আমাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য। 

২.
মালায়শিয়া এসে প্রথমত কষ্টের সঙ্গে সংগ্রাম করতে  হয়েছে। কখনো বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আবার রোদে শুকিয়েছি। আবার রোদে পুড়তে পুড়তে বৃষ্টিতে ভিজেছি। কষ্টের সঙ্গে কখনো আপোষ করিনি। ছুটে চলেছি বিরামহীন। সমস্ত ভাবনা জুড়ে থাকতো আমার বোনগুলো। ওদেরকে পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করতে হবে। এই দায়িত্ববোধ আমাকে থামতে দিতো না।  মনে হতো আমার জন্মই, আমার বোনগুলোর জন্য।

এই প্রবাস জীবনে চলতে পথে কতো কিছু দেখছি। মানুষ মনের চাহিদার প্রশ্রয়ে কতো পথে বিপথে টাকা নষ্ট করছে। মনের ভুলেও এমন কোনো চাহিদাকে আমি স্থান দেইনি। আমাতে আমি অটুট থেকেছি। কোনো কিছুর মোহ আকৃষ্ট করতে পারেনি। অবসর সময় ফেসবুক দেখে আর বই পড়ে কাটাই।

ফেসবুকে তিন হাজারেরও বেশি বন্ধু থাকলেও কারো সঙ্গেই চ্যাট হতো না। প্রেম তো দূরের কথা। আমার কোনো মেয়ে বন্ধুও ছিল না। ইচ্ছে করলে বন্ধুত্ব ও প্রেম করতে পারতাম। ভাবনা জুড়ে ছিল আমার কাঁধে চেপে বসা দায়িত্ব। যা আমাকে দাঁড়াবার অবসর দিতো না।

৩.
তিনটা বোন বিয়ে দেওয়া হলো। ওরা স্বামী সংসারে সুখি। বাকি মাত্র এক বোন। নিজের দায়িত্ববোধ কিছুটা হালকা হতে থাকলেও নিঃসঙ্গতা আমাকে ক্রমশই আঁকড়ে ধরতে থাকে। মনের মধ্যে কেমন যে একাকিত্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। কোনো এক অচেনা মানবীর হাতছানিতে বিভোর থাকি। নিঝুম কোনো পাহাড়ে মানবশূন্য পথে, ঝরেপরা পাতার মড়মড় শব্দ ভেঙে কে যেন হেঁটে যায় হৃদয়ের পথে! মন ছুটে যায় অজানায়, যেখানে নূপুর বাজে।

আজকাল মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। বারান্দায় বসে আকাশের বিশালতায় নিজেকে বিলিয়ে যায়। পৃথিবীর কোনো কিছুই যেন আমাকে আনন্দ দিতে পারছিল না। বিষণ্নতা আর একাকীত্ব  যখন কুড়েকুড়ে খাচ্ছিল। এলোমেলো কিছু ভাবনায় ধীরেধীরে গা ভাসাতে থাকি। একসময় হাই হ্যালো করতে থাকি। কেউ কেউ রিপ্লাই দিতো। আবার অনেকেই দেখলাম মেসেজগুলো ওপেনই করতো না।

ওদের মধ্যে একজন, নাম প্রকৃতি। স্ট্যাটাসগুলো খুব গুছানো। সাবলিল, মার্জিত। একটা লেখা পড়ে আমি বুঝতে পারলাম মেয়েটি পরিবারের বড়। একটি পরিবারের বড় মেয়েকে পাওয়ার স্বপ্ন নিভৃতে খুব গোপনে বেড়ে উঠেছে হৃদয়ে। সেদিন কতগুলো বাদামের একটা ছবি পাঠিয়ে লিখে দেই- ‘বড় ছেলের পক্ষ থেকে বড় মেয়ের জন্য। জবাবে ও আমাকে ধন্যবাদ দেয়, বন্ধু বলে সম্বোধন করে।

জীবনের প্রথম কোনো মেয়ে, বন্ধু বলে ডাকলো। এই বন্ধু শব্দটা আমার হৃদয়ে এক অন্যরকম ভালোলাগা দিয়ে গেলো। এ যেন এক পশলা বৃষ্টি। ধীরে ধীরে ও ভালো বন্ধু হয়ে ওঠলো। খুব অল্প সময়ে হৃদয়ের অনেকটা জায়গাও দখল করে ফেলল। এ যেন সেই অধরা। সারাজীবন অনুভবে কল্পনায় যাকে আমি সাজিয়েছি হৃদয়ের মন্দিরে। আমার সমস্ত কল্পনা অনুভূতির পূর্ণতা আমি পেতে থাকি ওর কাছ থেকে। অক্ষরের সঙ্গে অক্ষরের বিনিময়। কতো যে খুনসুটি। শব্দের সঙ্গে শব্দের। ও যেন আমার আঙুল হয়ে কথা বলে! থাকে মুখের মুচকি হাসিতে।

বর্ণ হয়ে দুলিয়ে যাই, স্বপ্নের লাল নীলপদ্ম! হাসতে হাসতে ও অস্থির হয়ে ওঠে। ওর হাসির ভাঁজে পাখা মেলে উড়তে শেখে স্বপ্ন আমার। দিন যায়, রাত আসে।  কিন্তু শেষ হয় না আলাপ।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com