শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
রাজনৈতিক সংখ্যালঘুদের রাজনীতি
আফসান চৌধুরী
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 5:18 PM

শক্তি বা আকারের জন্য সুপরিচিত না হওয়ায় চারটি রাজনৈতিক দল নিয়ে গঠিত নতুন ফ্রন্টের জন্ম প্রত্যাশিত মাত্রায় আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি। নেতৃবৃন্দ নিজেরাই দুই প্রধান রাজনৈতিক দল যে সামগ্রিক মনোযোগ আকর্ষণ করে থাকে তেমনটি পাওয়ার আশা করেননি।

অনেকে এমনকি এটাও ভুলে গেছেন, অদ্ভুত পাঁকে ক্ষমতাসীনদের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া এবং সরকারিভাবে বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি (জাপা) নামে তৃতীয় একটি দল রয়েছে। তবে এটা ¯্রফে কোনো ফ্রন্ট নাকি ক্ষমতা ভাগাভাগিতে জাপার বাইরে নতুন জোট অংশীদার হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের চিন্তাভাবনা?

রাজনৈতিক বা সামাজিক যে জোটই হোক না কেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতির অবিভাজ্য অংশ, এমনকি তা অপ্রয়োজনীয় হলেও। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী বিএনপি উভয়ই অখ্যাত অনেক দলের সঙ্গে জোট গড়েছে।

জোটবদ্ধতার সংস্কৃতিতে এ ধরনের ঘটনা ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক বিষয়।

আওয়ামী লীগ জোটের ব্যাপারে দু-একটি বিষয় জানে। কারণ তারা ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান শাসন আমলে প্রান্তিক অবস্থায় একসময়ের দুই বৈরি সম্প্রদায় পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু ও মুসলিমদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। প্রথম সফলতাটি এসেছিল ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সময়।

আর তাতেই কার্যত ‘পাকিস্তানের’ রাজনীতি কিংবা তখনকার পূর্বাংশে যা বাকি ছিল তার অবসান ঘটেছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শ্রেণি ও সম্প্রদায়জুড়ে এই সামাজিক জোটই বাংলাদেশের জন্মের পথ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক সংখ্যার সৃষ্টি করেছিল।

কিন্তু আরেকটি জোটের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিশেষ কোনো কারণ দৃশ্যমান না থাকা সত্তে¡ও সর্বশেষ এই জোট সৃষ্টির মানে কী? প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী দলগুলোর মধ্যকার নীতিগত বা বাস্তব পার্থক্যও বলতে গেলে অনুপস্থিত।

তারা কারা এবং কেন?
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং বিরোধী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ড. বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নতুন ফ্রন্টের নাম দেওয়া হয়েছে যুক্তফ্রন্ট। বেশ উচ্চাভিলাষীই বলতে হবে। তিনি বিএনপি ত্যাগ করেছিলেন তিক্ততা নিয়ে, গঠন করেছিলেন বিকল্পধারা।

নতুন ফ্রন্টের অন্য সদস্যরা হচ্ছেন আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, জেএসডি, আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য।

আ স ম আবদুর রব একসময় ছিলেন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতা। তিনি ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের চরমপন্থীদের নিয়ে জেএসডি গঠন করেন। অবশ্য ১৯৭৫ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর দলটি বিপাকে পড়ে, এর পর থেকে তারা স্থায়ীভাবে প্রান্তিক দলে পরিণত হয়।

তবে ১৯৮৮ সালে এরশাদের আমলে সাংবিধানিক প্রয়োজনে নির্বাচন দিতে হয়। তখন রব প্রায় অস্তিত্বহীন দলগুলোকে নিয়ে মহাজোট গঠন করে নির্বাচনকে হালাল করেছিলেন, তিনিও বেশ গুরুত্ব পেয়েছিলেন।

আবদুল কাদের সিদ্দিকী কিংবদন্তির মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় টাঙ্গাইল এলাকাকে পাকিস্তানি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব নিহত হলে তিনি ভারতে গিয়ে ১৯৭৫-পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগঠিত করেন।

অবশ্য পরে শান্তি স্থাপন করে ফিরে আসেন। অবশ্য তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে দলটির সমালোচকন হন। তিনি প্রান্তিক হলেও সোচ্চার ব্যক্তিত্ব।

মাহমুদুর রহমান মান্না ১৯৭১ সালের আগে আওয়ামী লীগের ক্যাডার হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। জেএসডি গঠিত হলে তিনি তাতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

আওয়ামী লীগ ত্যাগ করার আগে তিনি ছিলেন সাংগঠিক সম্পাদক। পরে তিনি নিজেই একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করেন। ২০১৫ সালে বিএনপির এক নেতার সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করার জন্য কারারুদ্ধ হন। ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারেই ছিলেন। তিনি এখন আর আওয়ামী লীগের প্রতি বৈরী বলে বিবেচিত নন।

কামাল হোসেন নেই?
গঠন প্রক্রিয়ার সময় যাদের নাম আলোচিত হয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলেন ড. কামাল হোসেন। তিনি গণফোরামের নেতা। একসময় তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের আওতায় প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে পরে দল ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ প্রধানের বিরাগভাজন তিনি।

২০০৭ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের তিনি অন্যতম রূপকার বলে সমালোচিত। ওই অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া উভয়কেই জেলে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে নির্বাচন দিয়ে সামরিক বাহিনী বিদায় নেয়, ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

বি চৌধুরীকে বাদ দিলে যুক্তফ্রন্টের সব নেতাই সাবেক আওয়ামী লীগার এবং ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে তাদের টুকটাক বিরোধিতায় তাদের মধ্যে কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে না।

কী ঘটতে চলেছে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে নির্বিষ জোট হিসেবে তাদেরকে সম্ভবত অন্যদের চেয়ে বেশি মুক্তভাবে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে। আর সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে এবং প্রয়োজন হলে সরকার গঠন করার জন্য তাদেরকে হাতের কাছেই পাওয়া যাবে।

যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয় কিংবা অংশ নেওয়া সম্ভব না হলে এই ফ্রন্ট এরশাদের জন্য যা করেছিল জেএসডি (রব) এবং ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের জন্য যা করেছিলেন এরশাদ, সেভাবেই আগ্রহী রাজনৈতিক অংশীদারের ব্যবস্থা করবে।

বিএনপি ইতোমধ্যেই ফ্রন্টকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে তাতে অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগ কিছুই বলেনি। আওয়ামী লীগের বিশাল গাড়ির বিষয়টি বিবেচনা করলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে তেমন রাজনৈতিক শক্তি না থাকা কোনো রাজনৈতিক জোটের প্রয়োজন নিজে থেকে দরকার নেই।

এটি কোনো প্রধান দলের টিকে থাকার জন্য কার্যকর। জোটটি নিজেরা বিএনপির বিরোধিতা করতে না চাইলেও বিষয়টি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য ভালোই হতে পারে।

আফসান চৌধুরী: সাংবাদিক


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com