শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পের নাজুক অবস্থা
এবি সিদ্দিক
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 5:15 PM

গেলো অর্থবছরে শিল্পখাতে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ছিল (বৃহৎ ও মাঝারি) ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা পূর্ববতী অর্থবছরে (২০১৫-১৬) ছিল ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এখন থেকে প্রায় একযুগ আগে, অর্থাৎ ২০০৪-০৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছির ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ। আমাদের শিল্পখাত খুব একটা ভাল অবস্থানে যাচ্ছে, তা বলা যাবে না। এর প্রধান কারণ হলো রাষ্ট্রায়ত্ব খাতে শিল্পায়ন হচ্ছে না। বরং রাষ্ট্রীয় খাতে বৃহৎ শিল্পগুলোকে বিরাষ্ট্রীয়করনের নামে ঢালাওভাবে শুধু বন্ধই করা হয়েছে, গড়ে তোলা হয়নি। আর বর্তমানে যেসব বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প আছে সেগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। কারণ-কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছর অতিক্রম করেছে। সেগুলো এখন খুড়িয়ে চলছে।

ধরা যাক সরকারি চিনি কলগুলোর অবস্থা। কুষ্টিয়া চিনি কল ১৯৬১ সালে, কেরু অ্যান্ড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড ১৯৩৮ সালে,  জয়পুরহাট  ১৯৬০ সালে, ঝিল বাংলা চিনি কল , ১৯৫৭ সালে, ঠাকুরগাঁও চিনি কল ১৯৫৬ সালে, নর্থ বেঙ্গল চিনি ১৯৩৩ সালে, নাটোর চিনি কল ১৯৮২ সালে, পঞ্চগড় চিনি কল ১৯৬৫ সালে, পাবনা চিনি কল লিমিটেড    ঈশ্বরদী, ১৯৯২ সালে, , ফরিদপুর চিনি কল ১৯৭৪    সালে, মোবারকগঞ্জ চিনি কল    কালীগঞ্জ,    ১৯৬৫ সালে, রংপুর চিনি কল ১৯৫৪ সালে, রাজশাহী চিনি কল ১৯৬২ সালে, শ্যামপুর চিনি কল ১৯৬৫ সালে, ও সেতাবগঞ্জ চিনি কল ১৯৩৩ সালে স্থাপিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে এধরনের একটি শিল্পের স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৫/৩০ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। কাজেই ৮০ বা ৮৪ বছরের একটি প্রতিষ্ঠান কি করে চলতে পারে? যেহেতু বহু আগেই সেগুলোর স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে বসে আছে। বিএমআর করে কোনোমতে সেগুলো ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে চলছে। এসব প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন করা না হলে হয়তো আর টিকিয়ে রাখাও সম্ভব হবে কি-না, সেটা সরকারই ভাল বুঝেন।

বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প সেক্টর আছে ৬ টি। এর মধ্যে বিসিআইসি, বিএসএফআইসি, বিএসইসি, বিজেএমসি, বিটিএমসি ও বিএফসিআইসি। আর এই ৬ সেক্টরের প্রতিষ্ঠান আছে ৬০/৬২টির মতো। এক সময় রাষ্ট্রায়ত্ব বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল প্রায় সাড়ে ৪ শত। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার ঢালাওভাবে রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে বন্ধই করে গেছে, গড়ে তোলেনি। বিশ^ব্যাংক আর আইএমএফ থেকে ঋণ পাওয়ার লোভে তাদের পরামর্শে রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পখাতকে ধংস করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানের শাসন কালে (১৯৭৫ - ৮১) মোট ২৫৫টি রাষ্ট্রায়াত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করা হয় যার মধ্যে ১১০টি ছিল বৃহৎ আকারের পাবলিক সেক্টর কর্পোরেশান এর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮২ সালের নতুন শিল্পনীতিতে বেসরকারিকরণের ওপর আরো জোর দেওয়া হয়, মাত্র ৬টি সেক্টর ছাড়া আর সমস্ত সেক্টরে বেসরকারি বিনিয়োগ অবাধ করে দেওয়া হয়। দেশীয় পুঁজিপতি ও বিদেশি সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের আস্থায় আসার জন্য অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে বেসরকারিকরণ শুরু হয়। এক বছরের মাথায় ২৭টি টেক্সটাইল মিল ও ৩৩টি পাট কল জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এছাড়া ১৬ মাসের মাথায় ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী ২১টি মাঝারি শিল্প বিক্রি করে দেওয়া হয়। যার ৭৮ শতাংশই ছিল লাভজনক এবং বিক্রি করার কিছুদিনের মধ্যেই যার ৮০ শতাংশ উৎপাদন হ্রাস ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

বিশ্বব্যাংকের দলিল অনুসারে, ১৯৮২ সালের শিল্প নীতি অনুসারে পাট ও টেক্সটাইল মিল ছাড়াও আরো ৪৭৪টি শিল্প ও ২টি সরকারি ব্যাংক বেসরকারিকরণ করা হয় (সূত্র: জুট ইন্ডাস্ট্রি রিহ্যাবিলিটিয়েশান ক্রেডিট- প্রজেক্ট কম্পি¬শান রিপোর্ট, ১৯৯০)। স্বাধীনতার পরপর রাষ্ট্রীয় পাটকল ছিল ৬৮টি। শাসক শ্রেণির লুটপাট ও অবহেলায় পাটকলগুলোকে লোকসানি বানানো হয়। লোকসান কমানো ও পাটশিল্পের বিকাশের নামে বিশ্বব্যাংকের জুট ইন্ডাস্ট্রি রিহ্যাবিলিটিয়েশান ক্রেডিট প্রগ্রাম চলাকালে ১৯৮২ সালের নতুন শিল্পনীতির আওতায় ৩৫টি বেসরকারিকরণের পর রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল দাড়ায় ৩৩টি। এরপর ১৯৯৪ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে জুট সেক্টর এডজাষ্টমেন্ট ক্রেডিট (জেএসএসি) প্রোগ্রাম যখন হাতে নেওয়া হয় তখন ২৯ পাটকলের সম্পূর্ণ মালিকানাসহ পাট খাতের ৭৮ শতাংশ মালিকানা ছিল সরকারি খাতে। বিশ্বব্যাংকের ডকুমেন্ট অনুসারে এই ঋণ প্রকল্পের ঘোষিত প্রাধাণ উদ্দেশ্যগুলো ছিল: রাষ্ট্রায়ত্ব ২৯টি পাটকলের মধ্যে ৯টি’কে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া এবং ২টি পাটকলের ‘বাড়তি’ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস বা ডাউন সাইজিং; রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলগুলো থেকে ২০ হাজার শ্রমিক ছাটাই; বাকি ২০টি রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকলের মধ্যে থেকে কমপক্ষে ১৮টি পাটকল বেসরকারিকরণ; এই কর্মসূচী নেওয়ার সময় বিশ্বব্যাংকের ডকুমেন্টেই স্বীকার করা হয়েছে পাট খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ নির্ভরশীল। তারপরও রাষ্ট্রীয় কারখানা বন্ধ করা, ডাউন সাইজ করা ও শ্রমিক ছাটাই করার পেছনে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল: লস কমিয়ে শহুরে ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি লাভজনক খাত হিসেবে পাট শিল্পকে প্রতিষ্ঠা করা। বলাই বাহুল্য, বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের মতোই এই প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত পাট শিল্পের বিশিল্পায়নই কেবল ঘটিয়েছে যার মাধ্যমে পাট উৎপাদনকারী চাষী থেকে শুরু করে পাট শিল্পের শ্রমিক এমনকি বেসরকারি খাতও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক তার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কলকারখানা বন্ধ করে ২০ হাজার শ্রমিক ছাটাইয়ের ‘সাফল্যে’ সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও স্বীকার করছে: বেসরকারি খাতের উৎপাদন ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে মোট উৎপাদন ক্ষমতার ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে, জেএসসি প্রোগাম শুরুর আগে যা ছিল ৩৫ শতাংশ। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত মোট ৭৫টি রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশান কমিশন ২০১০ সালে বেসরকারিকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে একটি সমীক্ষা করে। ‘বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সমীক্ষা ২০১০’ নামের এই প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় ৭৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানকেই বন্ধ পাওয়া গেছে। সংক্ষেপে এই হলো আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পের অবস্থা। বেসরকারি খাতে পোশাক শিল্প ছাড়া অন্যান্য খাতে শিল্পের খুব একটা উন্নয়ন হয়েছে বা হচ্ছে তাও বলা যাবে না। বিনিয়োগ খাতে বাংলাদেশের চিত্রটা ভালো নয়। বিনিয়োগ বোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে বেসরকারি খাতে (নিবন্ধীত) বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ যা এক দশক পূর্বে ছিল ১২৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।

গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এখাতে প্রবৃদ্ধির হার বলেনি বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে স্থানীয় বিনিয়োগ ক্ষেত্রে প্রতিবছরই টাকার পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু শিল্পের খুব একটা অগ্রগতি নেই। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পের অবস্থা ভালো নয়। এখাতে সরকারি বিনিয়োগ তো নেই, বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ খুব একটা হচ্ছে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ যেটা হচ্ছে সেটা সার্ভিস খাতে। বিনিয়োগের গতি ধীর হওয়ায় কর্মসংস্থানও কমছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে কর্মসংস্থানের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার ৬৬২ জন যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪১১ জনে। আর গত ২০১৬-১৬ অর্থবছরের ৬ মাসে কর্মসংস্থানের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৯০৯ জনের। বেসরকারি খাতে শিল্পায়নের নামে প্রতিবছর লাখ লাখ কোটি ঋণ যাচ্ছে, কিন্তু সেই টাকায় শিল্প হচ্ছে না। শিল্পের নামে ঋণ গেলেও টাকা ব্যয় হচ্ছে অন্যান্য ব্যবসায়। যার ফলে খেলাপী ঋণের পরিমাণটাও বাড়ছে।

আধুনিক বিশ^ হচ্ছে শিল্পায়নের। কিন্তু বাংলাদেশ চলছে উল্টোপথে। রাষ্ট্রায়ত্ব খাতে শিল্প হচ্ছে না, বরং বন্ধ করা হচ্ছে। আর রাষ্ট্রায়ত্ব খাতে এখনও যেসব শিল্প আছে সেগুলোকে টিকিয়ে রাখার তেমন উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিনের পুরাতন ভারি শিল্পগুলোকে আধুনিকায়ন করা জরুরি। সেটাও খুব একটা হচ্ছে না। মূল কথা হচ্ছে যে, রাষ্ট্রায়ত্ব খাতে যদি শিল্পায়ন করা না হয়, তবে কাঙ্খিত অর্থনৈতিক উন্নয়নে পৌঁছানো কঠিন হবে। শিল্পায়ন ছাড়া বিশে^র কোনো দেশ উন্নয়ন করতে পেরেছে, এমন নজির নেই।

এবি সিদ্দিক: সাংবাদিক


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com