শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
বিভাগ থাকছে না মাধ্যমিকে
নূরুজ্জামান মামুন
Published : Wednesday, 6 December, 2017 at 12:35 AM, Update: 06.12.2017 2:07:44 PM

মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষা পদ্ধতি চালু হতে যাচ্ছে। নবম শ্রেণিতে থাকবে না বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শাখার আলাদা বিভাগ। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয় নির্বাচন করবে শিক্ষার্থীরা। এ প্রস্তাব মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের। তারা জেএসসি ও এসএসসিতে পরীক্ষার বিষয় কমানোরও প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।  

বিষয়টি স্বীকার করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-১) চৌধুরী মুফাত আহমেদ আজকালের খবরকে বলেন, শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশগুলো বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শিক্ষাবিদরা ইতিবাচক মত দিয়েছেন। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিক্ষাবিদদের সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে পাবলিক পরীক্ষায় বিষয় কমবে। শিক্ষার্থীরা চাপমুক্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

প্রসঙ্গত, মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দিতে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয় গত বছর। 

সদস্যদের নিয়ে গত বছর ২৫ ও ২৬ নভেম্বর কক্সবাজারে দুই দিনের আবাসিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষাবিদরা বেশকিছু সুপারিশ করেন। সুপারিশ বাস্তবায়নে কয়েকটি সাব-কমিটিও গঠন করা হয়। সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) মন্ত্রণালয়ে একটি বর্ধিতসভা অনুষ্ঠিত হয়। 
সভায় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা সাব-কমিটি আট দফা সুপারিশ প্রস্তাব করে। তাতে বলা হয়েছে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তু গুরুত্ব অনুসারে তিন গুচ্ছে ভাগ করা। ‘ক’ গুচ্ছে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত। ‘খ’ গুচ্ছে বিজ্ঞান, সমাজ পাঠ (ইতিহাস, পৌরনীতি ও ভ‚গোল)। ‘ক’ ও ‘খ’ গুচ্ছ বাধ্যতামূলক। আর ‘গ’ গুচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি, চারু-কারুকলা, শরীরচর্চা ও খেলা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, কৃষি ও গার্হস্থ্য, নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি। এগুচ্ছে প্রকৌশল প্রযুক্তি (বিদ্যুৎ, যন্ত্র, কাঠ, ধাতু ইত্যাদির ব্যবহারিক জ্ঞান ও প্রয়োগ) যুক্ত করার মত দিয়েছে। অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় চারু-কারুকলা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, কৃষি, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, শরীরচর্চা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়গুলো বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে বর্তমানে অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা ১০টি বিষয় থেকে তিনটি কমবে। সাতটি বিষয়ে পরীক্ষা হবে।

শিক্ষাবিদদের মতেÑ ‘গ’ গুচ্ছের বিষয়ে জ্ঞান ও তত্তের চেয়ে চর্চা, আগ্রহ বৃদ্ধি, মানোভাবের পরিবর্তন ও সৃজনশীলতার প্রকাশ এবং প্রায়োগিক দক্ষতা বেশি প্রয়োজন। এসব বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা না নিয়ে বিদ্যালয়ভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও এর সঙ্গে যুক্ত সুচিন্তিত সহশিক্ষাক্রমিক কার্যাবলির নিবিড় যোগ স্থাপন করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ধারণা দিতে নির্দেশিকা তৈরি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ভবিষ্যতের কর্ম ও পেশা নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে নবম ও দশম শ্রেণিতে আগের শ্রেণির গুচ্ছের সঙ্গে ‘ঘ’ গুচ্ছ প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুচ্ছে পদার্থ, রসায়ন, জৈববিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, হিসাব, বিপণন, ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতি। ‘ঘ’ গুচ্ছ থেকে যেকোনো দুটি বিষয় শিক্ষার্থীরা নিতে পারবে। শিক্ষার্থীরা ইচ্ছে করলে ‘ঘ’ গুচ্ছ থেকে ঐচ্ছিকভাবে আরও একটি বিষয় নিতে পারবে। তবে বাধ্যবাধকতা নেই।

কমিটির সদস্যরা জানান, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পাঁচটি বিষয় বাধ্যতামূলক ও দুটি ঐচ্ছিক বিষয় প্রস্তাব করা হয়েছে। ধর্ম বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা না নিলে একটি বিশেষ শ্রেণি ক্ষুব্ধ হতে পারে। সে বিবেচনায় ধর্ম ও তথ্যপ্রযুক্তি বাধ্যতামূলক বিষয় করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ঐচ্ছিক বিষয় একটি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণিতে পাঁচটি বাধ্যতামূলক বিষয় ছাড়া ‘গ’ গুচ্ছ থেকে দুটি ও ‘ঘ’ গুচ্ছ থেকে দুটি বা তিনটি বিষয় নিতে হবে। এর ফলে এসএসসি পরীক্ষায় ১৪টি থেকে চারটি বিষয় কমবে। অর্থাৎ ঐচ্ছিক বিষয়সহ মোট ১০টি বিষয়ে পরীক্ষা হবে।  

কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় ১৩টি বিষয় থেকে তিনটি বিষয় পরীক্ষা কমিয়ে ফেলেছে। সদ্যসমাপ্ত অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা এবং চারু-কারুকলা বিষয়ে পরীক্ষা হয়নি। এসব বিষয়ে বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর এসএসসিতে শারীরিক শিক্ষা ও ক্যারিয়ার শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছে। আগামী বছর থেকে এ দুই বিষয়ে পরীক্ষা হবে না। তবে শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন করা হবে। মূল্যায়নের নম্বর সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ডে পাঠাতে হবে। মূল মার্কশিটে এসব বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর উল্লেখ থাকবে। তবে পরীক্ষার ফলে কোনো প্রভাব পড়বে না।

কমিটির সদস্যরা জানান, পাঠ্যবইয়ের তত্ত¡ ও তথ্য আয়ত্ত হলো কিনা, যাচাই করতে পাবলিক পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। পাঠ্যপুস্তকের বিষয় জানা মূলত স্কুলভিত্তিক অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক পরীক্ষা ও ধারাবাহিক গাঠনিক মূল্যায়নের ক্ষেত্র। শিক্ষণ-শিখনের সময় বাড়াতে পাবলিক পরীক্ষার ধরন পরিবর্তন করে স্বল্প সময়ে শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে তিন ঘণ্টার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য মত দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ ও অশান্তি লাঘব হবে। মাসব্যাপী পরীক্ষা নিতে শিক্ষকদের ব্যস্ত থাকতে হবে না। শিক্ষার্থীরা পাঠদান থেকে বঞ্চিত হবে না।

কমিটির সদস্যরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় বাড়িয়ে এক ঘণ্টা করার প্রস্তাব করেছেন। আবশ্যিক বিষয়ের জন্য যথেষ্ট সময় নির্ধারণ করে সাপ্তাহিক ও বার্ষিক সময়বিন্যাস, পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সময় কমিয়ে বছরব্যাপী পাঠদানের সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। 
সূত্র জানায়, ১৮ জেলার ৮৬ জন শিক্ষকের মতামত, ১১টি সভা, ছয়টি কনফারেন্স, দুটি স্কুলের ১০০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (এফডিজি), ২১ জন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞের মতামতের আলোকে এসব প্রস্তাব দিয়েছে শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা কমিটি।

সূত্র আরও জানায়, সভায় শিক্ষাক্রম পরিমার্জন কমিটির সুপারিশ উপস্থাপন করেন কমিটির সদস্য ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মঞ্জুর আহমেদ। সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। সভায় উপস্থিত কমিটির প্রায় সব সদস্য প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক ব্যক্তি জানান, বিভাগ তুলে দিয়ে গুচ্ছ পদ্ধতি চালু করলে বিজ্ঞান বিষয়ের গুণগত মান কমে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন ড. জাফর ইকবাল। তিনি বলেন, নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকলে উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে শিক্ষার্থীরা সিলেবাসের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না। কারণ বর্তমানে নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের বিষয়ের বইগুলোয় যেসব কনটেন্ট আছে, তা মানসম্মত নয়। নতুন পদ্ধতি চালু করলে বিজ্ঞান বইয়ের মান যাতে কমে না যায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। মান ঠিক রেখে নতুন পদ্ধতি চালু করতে তার আপত্তি নেই। তা না হলে তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলনে নামবেন।

বৈঠকে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, অনেক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকে এক বিভাগ থেকে পাস করে উচ্চশিক্ষা নেয় অন্য বিষয়ে। শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিকে বিভাগ নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত তিনি গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতি চালুর মত দেন।

ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক অধ্যাপক ড. মঞ্জুর আহমেদ আজকালের খবরকে বলেন, মাধ্যমিক স্তরে বিভাগভিত্তিক পড়াশোনার পরিবর্তে গুচ্ছভিত্তিক প্রস্তাব করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে সব শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, ভ‚গোল ও ইতিহাস বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে পারবে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভাগ পছন্দ করে ভর্তি হবে। 

আমেরিকায় এ পদ্ধতি চালু আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাকরণে দক্ষতা যাছাই করতে পাবলিক পরীক্ষার নয়। ব্যাকরণ লিখতে পাড়া ও বলতে জানা চর্চার বিষয়, মুখস্থ করার বিষয় নয়। মুখস্থবিদ্যা ও শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ কমাতে প্রতিটি বিষয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন ও পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করার জন্য শিক্ষকদের দক্ষ করতে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছি। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে হবে।

আজকালের খবর/এসএ




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com