শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
শাহরিয়ারে স্বস্তি ঝন্টুর
শাকিল আহম্মেদ, রংপুর
Published : Monday, 4 December, 2017 at 9:51 PM, Update: 05.12.2017 2:06:29 PM

রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনে প্রতীক পেয়ে গেছেন প্রার্থীরা। প্রচারেও নেমে পড়েছেন তারা। কে জিতবেন, কেন জিতবেন- শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় মেয়র পদে কে কোন প্রতীক পাচ্ছেন, তা আগেই সবার জানা। তবে জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী প্রার্থী মকবুল হোসেন আসিফ শাহরিয়ার কোন প্রতীক পান, সেদিকে নজর ছিল সবার। তিনি পেয়েছেন হাতি। শাহরিয়ার জাপার চেয়ারম্যান এরশাদের ভাতিজা। এরশাদ তাকে নির্বাচন থেকে সরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু ভাতিজা চাচার কথা শুনেননি।

গতকাল সোমবার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু নৌকা, বিএনপির কাওসার জামান বাবলা ধানের শীষ এবং জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনযুদ্ধে নেমে পড়েছেন। তিনজনই মূল প্রতিদ্ব›দ্বী। তবে শাহরিয়ারকেও বাইরে রাখা যাচ্ছে না। তিনিও শক্ত প্রতিদ্ব›দ্বী, এমনটা মনে করছেন ভোটাররা।

এরশাদের নির্দেশ উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত নিজ সিদ্ধান্তেই অনড় থাকলেন এরশাদের ভাতিজা ও পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক এবং সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ। রসিক নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন রবিবার আসিফ তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। এর আগে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর কারণে ও মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য আসিফকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এরশাদ। নির্দেশ অমান্য করলে জাতীয় পার্টির সব পদ ও পদবি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করে বহিষ্কারের ঘোষণা দিলেও তাতে কর্ণপাত না করে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন আসিফ। ইতোমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে শতাধিক কেন্দ্র ভোট কমিটি গঠন করে ফেলেছেন তিনি।

নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করলেও শেষ পর্যন্ত এরশাদ তার ঘোষণা কার্যকর করেননি। উল্টো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে রবিবার এরশাদ পার্টি নেতাকর্মী নিয়ে শারীরিক চেকআপের জন্য সিঙ্গাপুর চলে গেছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে আসিফকে বহিষ্কার কিংবা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক গ্রহণ করায় রংপুরে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে নেতাকর্মীদের মাঝে নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি স্বতন্ত্র পদে ভোট করছি। দলীয় পদে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। আমি এর আগে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। নেতাকর্মীরা আমাকে মেয়র পদে দেখতে চায়। তাই তাদের দাবি উপেক্ষা করতে পারিনি। দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও আমি তা মাথা পেতে নেব।
জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী রংপুর মহানগর সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, তিনি বিপুল জনসমর্থন পাচ্ছেন। ভোটাররা মনে করছেন এবার সত্যিকার অর্থে ঠিক মানুষকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এর আগে চাপিয়ে দেওয়া লোকদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাই লাঙ্গল প্রতীকের পক্ষে এবার বিপুল জোয়ার এসেছে।
 
জাপা বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে তিনি বলেন, আসিফের বয়স কম, রাজনীতি বোঝে না। তার সঙ্গে কেউ নেই, জাপার সব নেতাকর্মী আমার পক্ষে রয়েছে। লাঙ্গলের জোয়ার উঠেছে। যেখানেই যাচ্ছি সেখাই সবাই লাঙ্গলে ভোট দেবেন বলে আশ্বস্ত করছেন। আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হব।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু বলেছেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এর আগে আমাকে রসিকের মেয়র পদে কাজ করার সুযোগ দেওয়ায় আমি নির্বাচিত হয়েছিলাম। গত ১৬ বছরে রংপুর অঞ্চলের সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ নৌকা প্রতীক হাত ছাড়া হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী আমাকে বিশ্বাস করে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন। আমি আল্লাহর দোয়ায় ও শেখ হাসিনার আশীর্বাদে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হতে পারলে এ অঞ্চলের নৌকার জাগরণ তৈরি করব। হারানো আসনগুলো নৌকা মার্কায় বিজয়ী করে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। রংপুরের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকা প্রতীক আমাকে দিয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু ও মহানগর কমিটির সভাপতি সাফিউর রহমান সফি এবং সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মÐল জানান, আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে নৌকার বিজয়ের লক্ষ্যে দিন-রাত পরিশ্রম করছি। প্রধানমন্ত্রী রংপুরের উন্নয়নের দায়িত্ব নেওয়ার পর যে উন্নয়ন হয়েছে স্বাধীনতার পরবর্তীতে কোনো সরকার রংপুরের এত উন্নয়ন করেনি। সে কারণে রংপুর সিটি করপোরেশনের ভোটাররা নৌকা প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো প্রতীকের নাম শুনতে চাচ্ছে না। আমরা যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই নৌকার গণজোয়ার লক্ষ করছি।
মহানগর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক তৌহিদুর রহমান টুটুল বলেন, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে গতকাল সোমবার রাতে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের নেতৃতে ২১ সদস্যের একটি টিম রংপুরে আসছেন। তারা ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত রংপুরে অবস্থান করবেন। এছাড়া দলের আরও শীর্ষ নেতারা সিটি করপোরেশনের ভোট উপলক্ষে রংপুরে আসবেন।

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মহানগর সহ-সভাপতি কাওসার জামান বাবলা জানান, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট হলে তার বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। তার মনোনয়ন বাতিলের জন্য সরকার নানা ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র হয়নি। তিনি জানান, ইতোমধ্যে আমি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল রিজভীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তারা রংপুরে এসে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন। এছাড়া দলের আরও শীর্ষ নেতা রংপুর আসবেন এবং নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত থাকবেন। রংপুরের নির্বাচনে কোনো ষড়যন্ত্র করা হলে তার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে। এ কারণ বিএনপির হাইকমান্ড রংপুরের নির্বাচনের ওপর গভীর দৃষ্টি রাখছে।

বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনার জন্য রংপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল বিকালে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক লালমনিরহাট জেলার কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলু নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে সিটি করপোরেশন নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন।

ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে হাতি কাকে ওঠাবে বা কাকে টেনে নামাবে। স্বাভাবিকভাবেই বেকায়তায় পড়েছেন জাপা প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। জাপার ভোট ভাগ হবে। আর এ বিভক্তির ফল ভোগ করবেন কে?  আওয়ামী লীগের ঝন্টু নাকি বিএনপি বাবলা? এমন প্রশ্ন নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা-বিশ্লেষণ।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুবিধাটা শেষ পর্যন্ত পাবেন সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুই। ঝন্টুর ভোট আসবে কয়েক দিক থেকে। আওয়ামী লীগের ভোট তো আছেই। তার নিজস্ব ভোট রয়েছে। যার একটি বড় অংশ জাপার। আর রয়েছে অবাঙালিদের ভোট। অবাঙালিদের সঙ্গে ঝন্টুর ভালো সম্পর্কের বিষয়টি রংপুরবাসী সবাই জানে। আর জাতীয় পার্টির ঘরের শত্রæ বিভীষণ হয়ে ওঠা শাহরিয়ার তার জন্য লাভজনক বলে ধরে নিয়েছেন ভোটাররা।

রংপুর জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে দীর্ঘদিন পরিচিত ছিল। বর্তমানে সেটি অনেকটাই দুর্বল। তবে অগ্রাহ্য করা যায় না। জাপার যদি একক প্রার্থী থাকতো, তাহলে তিন হয়ে ওঠতেন শক্ত প্রতিপক্ষ। কিন্তু জাপা এখন দুইভাগে বিভক্ত। এর অর্থ দলের ভোটও ভাগ হয়ে যাবে। রংপুরের লোকজন ধরেই নিয়েছেন জাপার মূল প্রার্থীর ভোটে থাবা বসাবেন শাহরিয়ার। আর এ থাবার আকৃতি কিন্তু ছোট নয়।

জাপার এ বিভক্তির সুযোগটা বিএনপি পক্ষে যাবে না বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বিএনপি মধ্যে ব্যাপক বিরোধ-কোন্দল রয়েছে। দলটি রংপুরে এমনিতেই দুর্বল। মনোয়নবঞ্চিত দুই নেতা নিষ্ক্রিয়। ঝন্টুর সমর্থকরা বাবলাকে মূল প্রতিদ্ব›দ্বীই মানতে রাজি নয়।

জাপার বিভক্তি, বিএনপির দুর্বলতা-কোন্দল আর ঝন্টুর নিজস্ব শক্ত অবস্থান ও ক্লিন ইমেজ নির্বাচনের ফল নির্ধারণে জোরালো ভ‚মিকা রাখবে বলে মনে করেন ভোটাররা। ভোটার এর সঙ্গে যোগ করে বলছেন জাপার বিদ্রোহী প্রার্থী শাহরিয়ার আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঝন্টুর জন্য রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের গতকাল সোমবার প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতীক পাওয়ার পর প্রার্থীরা তাদের সমর্থকদের নিয়ে আনন্দ মিছিল এবং গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় তারা মিষ্টি বিতরণও করেন। মেয়র পদে মূল চার প্রার্থী ছাড়াও বাসদের রংপুর জেলা আহŸায়ক আব্দুল কুদ্দুস মই, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রংপুর জেলা সভাপতি এ টি এম গোলাম মোস্তফা বাবু হাতপাখা, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সেলিম আখতার আম প্রতীক পেয়েছেন বলে রিটার্নিং ও রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬৫টি জন প্রার্থীর প্রতীকও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতীক একাধিক প্রার্থী দাবি করেছেন, লটারির মাধ্যমে সেসব প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩৮ ও পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৬ জন। পুরুষের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ২৮২ জন। ভোটার বেড়েছে ৩৬ হাজার ২৫২ জন। ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৯৩টি।

আজকালের খবর/এসএ

 


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com