শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
আগাম নির্বাচন: হিসাব কষছে আওয়ামী লীগ
বাহরাম খান
Published : Monday, 4 December, 2017 at 2:48 PM, Update: 04.12.2017 3:10:07 PM

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সরকারের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষে নাকি আগাম হতে যাচ্ছে- রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে। আগাম নির্বাচনী প্রস্তুতির কথা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন। এর বাইরে আওয়ামী লীগের আরও কয়েকটি সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করছেন না।

গত দুই দিনে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় পাঁচ জন নেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। সভাপতিমÐলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজকালের খবরকে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের একটা আমেজ মাঠে আছে। বিএনপিও নির্বাচন নির্বাচন করছে। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের অনেক অর্জন রয়েছে। এই চার মাসে ঐতিহাসিক অর্জনের তারিখে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দল ও সরকারের ভালো কাজগুলো তুলে ধরে ২০১৮ সালের মার্চের শেষে কিংবা এপ্রিলের প্রথম দিকে আগাম নির্বাচন ঘোষণার এটা সম্ভাবনা আছে। তবে, কোনো কোনো নেতা আগাম নির্বাচনের বার্তাটাকে সরকারের একটা কৌশল হিসেবে অবিহিত করেছেন।

আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক আগাম নির্বাচনের বিষয়টি নাকচ করে আজকালের খবরকে বলেন, বিএনপি যাতে আন্দোলন ও দল গুছানোর বিষয়ে একটু ধাঁধার মধ্যে থাকে সে জন্যই আগাম নির্বাচনের আওয়াজটা তোলা হয়েছে। এই নেতার মতে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের কথা প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক নেতাই তাদের বক্তব্যে অনেক আগে থেকেই উল্লেখ করছেন। এরপরও যদি কোনো পরিবর্তন আসে সেটা পিছিয়ে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যেতে পারে। এগিয়ে আনার কোনো যুক্তি এখনও পর্যন্ত হিসাবে মিলছে না।

মন্তব্য জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, গণতান্ত্রিক নিয়মে আগাম নির্বাচন অস্বাভাবিক কিছু না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সব সময় সব ধরনের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকে। তবে, আগাম নির্বাচন ঘোষণার একমাত্র এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। 

গত শুক্রবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ আগাম নির্বাচনে নিজ নিজ দল প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন। গত ২৯ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নিজেও আগাম নির্বাচনে কমিশন প্রস্তুত আছে জানালে তা টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন আজকালের খবরকে বলেন, আগাম নির্বাচনের কোনো বার্তা হাইকমান্ড থেকে নেই। এ বিষয়ে দলে কোনো কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে না। তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সুশৃঙ্খল দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যেকোনো সময় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত থাকে।

সংবিধান কী বলে
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি। সংসদ সদস্যরা শপথ নেন ৯ জানুয়ারি। মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে ১২ জানুয়ারি। এই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। সরকার স্বাভাবিক মেয়াদ পূরণ করে নির্বাচন দিতে চায় তাহলে সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর যদি স্বাভাবিক মেয়াদ পূরণ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দেওয়ার আহŸান জানান সে ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে সংবিধানে।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ দফা এবং ক ও খ উপদফায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে- (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে। তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপদফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপদফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’

বিএনপির দুই দাবির একটিতে ছাড়
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচনের আগেই সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে আগামি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, এর মধ্যে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার দাবি তারা মেনে নিতে পারেন। তবে, কোনোভাবেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে এখনো পর্যন্ত অটল তারা।

কিন্তু সংবিধানের ১২৩(৩)(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পূর্ববর্তী সসংসদের সদস্যদের পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কার্যভার নিতে পারবেন না। অর্থাৎ সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে না দিলে ২৯জানুয়ারি ২০১৯ সাল পর্যন্ত বতর্মান সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে। তাই সংবিধান অনুযায়ী সরকারের মেয়াদ অবসানের ৯০ দিন আগে নির্বাচন করলে বর্তমান সংসদ সদস্যরা ক্ষমতায় থেকে যাবেন। সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে’।

আওয়ামী লীগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী যদি পুরো সময় কাটিয়ে এবং সংবিধান সংশোধন না করেই বিএনপির একটি দাবি আমলে নেন সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে পরামর্শ দেবেন। আর যদি সংসদ সদস্যদের পূর্ণ মেয়াদ শেষে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চান সেক্ষেত্রে জানুয়ারিতে নির্বাচন গড়াতে পারে। এই দুটি বিকল্পের ক্ষেত্রে প্রথমটিই অগ্রাধিকার পেতে পারে বলে জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ
চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশনাররা শপথ নেন। এরপর গত ১৬ জুলাই নির্বাচন কমিশন থেকে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে একটি ‘কর্মপরিকল্পনা’ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে পর্যাক্রমে সাতটি ধাপ পার করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছে কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী পরিকল্পনা সাতটি হচ্ছে, প্রথমত, আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার, দ্বিতীয়ত, নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ গ্রহণ, তৃতীয়ত, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, চতুর্থত, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং সরবরাহ, পঞ্চমত, বিধি-বিধান অনুসরণপূর্বক ভোটকেন্দ্র স্থাপন, ষষ্ঠত, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা এবং সপ্তমত, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ।

উল্লিখিত সাতটি পরিকল্পনার মধ্যে শুধুমাত্র দ্বিতীয় পরিকল্পনার কাজটি পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ করতে পেরেছে কমিশন। এ ছাড়া অন্য পরিকল্পনারগুলোর দু-একটি প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। দুইটি মাঝামাঝি পর্যায়ে এবং বাকি দুইটি পরিকল্পনার কাজ এখনো শুরুই করতে পারেনি কমিশন। এমন অবস্থায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগাম সংসদ নির্বাচনে প্রস্তুতির বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা তাদের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে মেলে না। তাই আগাম নির্বাচন নিয়ে যে জল্পনা চলছে তা বাস্তবে কি হবে তা নতুন সময়ই বলে দেবে।

আজকালের খবব/এসএ



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com