শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
শঙ্কা-উদ্বেগ বিএনপিতে
মোজাম্মেল হক তুহিন
Published : Monday, 4 December, 2017 at 2:47 PM, Update: 04.12.2017 3:10:20 PM

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর সম্ভাব্য রায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন দলটির নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ দুর্নীতির দুই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা শঙ্কা, উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। রাজনীতির অঙ্গনে আগাম নির্বাচনে কথাবার্তা ওঠায় সেই শঙ্কা আরও বেড়েছে। গতকাল রবিবারও বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার মামলার পরিণতি নিয়ে কথা বলেছেন। এমনকি দলটির মধ্যে এমন আলোচনাও চলছে যে নির্বাচনকে সামনে রেখে তরিঘড়ি করে খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখতে চায় সরকার। এই অবস্থায় বিএনপির করণীয় কী হবে? সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে নেতাকর্মীদের মাথায়। তবে দলটির কিছু কিছু নেতার অভিমতÑ এসব চক্রান্ত আর নীল নকশা করে সরকার পার পাবে না। কোনোভাবেই আর একতরফা নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। খালেদা জিয়ার সাজা হলে প্রয়োজনে তা আইনিভাবে ও রাজপথে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নীতিনির্ধারণী ফোরামেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সেসব আলোচনায় পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে করণীয়ও ঠিক করে রেখেছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

বিএনপি চেয়ারপারসনের মামলার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে গতকাল রবিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তাদের (সরকার) ভয়ভীতির সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে খালেদা জিয়া ও তার জনপ্রিয়তা। তাই অনির্বাচিত সরকারের চিন্তা-ভাবনায় সামনে এখন একটি পথ উন্মুক্ত আর সেটি হচ্ছে খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে নির্বাচন থেকে দুরে  রাখা। কিন্তু একটি কথা খুব স্পষ্ট, খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে নির্বাচনী ফসল ঘরে তুলতে পারবে না সরকার। বরং তাদেরক উচ্চমূল্য দিয়ে বিদায় হতে হবে।’

 নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ‘নীলনকশা’ করছে বলে অভিযোগ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গতকাল এক আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘প্রক্রিয়া চলছে দেশনেত্রীকে (খালেদা জিয়া) সাজা দেওয়ার। স্বাভাবিক বিচারের মাধ্যমে না, প্রয়োজনে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া তারা প্রয়োগ করবে।’ আওয়ামী লীগকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘সরকার যদি ভাবে তাকে সাজা দিলে সব শেষ হয়ে যাবে, এটা খুব সহজ হবে না। আওয়ামী লীগ যদি ভাবে আমাদের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সাজা দিয়ে দেবেন, এত সহজ হবে না।’

খালেদা জিয়ার সাজা হলে বা নির্বাচনে অয্যেগ্য হলে বিএনপির করণীয় কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ও গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আজকালের খবরকে বলেন, ‘মামলার গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে খুব দ্রæতই খালেদা জিয়ার সাজা হবে। এমনটি হলে বিএনপির উচিত হবে বিষয়টিকে আইনিভাবেই মোকাবিলা করা। উচ্চ আদালত রয়েছে সেখানে গেলে হয়তো মামলা বাতিল হতে পারে বা খালেদা জিয়া জামিন পেতে পারেন।’

বিএনপির পরামর্শক হিসেবে পরিচিত এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করলে বা জেলে ঢোকালেই বিএনপিকে ভাঙা যাবে না। বিএনপি দুর্বলও হবে না। এটা সরকারের জন্য বাড়াবাড়ি হবে, দুঃসাহসী কাজ হবে। তবে খালেদা জিয়াকে যদি জেলে পাঠানোও হয়, তবুও বিএনপির উচিত হবে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া।’ তার অভিমত হলোÑ ‘চলমান মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপির প্রতি মানুষের সহানুভ‚তি আরও বাড়বে। যেটি ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির জন্য ইতিবাচক হবে, আর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আরও কমবে।’

খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে পাঠানো হলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না বলে ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা। তবে দলের মধ্যে এমন আলোচনাও রয়েছে যে, এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে সরকার বিএনপির নাম দিয়ে দলের একটি অংশকে নির্বাচনে নিতে পারে। সেক্ষেত্রে ওয়ান ইলেভেনের সময় সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া অংশটিকে কাজে লাগাতে পারে সরকার। এছাড়াও বিএনপির জোটভুক্ত শরিকদের কয়েকটি দলকে বাইরে বের করে বিএনপি জোটের ব্যানারে নির্বাচনে নিতে চেষ্টা করবে সরকার। এজন্য সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খালেদা জিয়ার বিভিন্ন মামলার সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘দুইটি মামলার গতি অবিশ্বাস্য এবং অস্বাভাবিকভাবে রায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রায় যদি নেতিবাচক হয় তবে নিম্ন আদালতে রায়ের পর হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগে আমাদের আইনি লড়াই চলবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে আমরা আতঙ্কিত নই তবে শঙ্কিত। কারণ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘নিম্ন আদালত পুরোটাই সরকারের দখলে। এখন সরকার উচ্চ আদালতের দিকে হাত বাড়াচ্ছে।’ তাই আমরা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সরকার নিম্ন আদালতে বিশেষ করে রাজনৈতিক মামলাগুলোর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। অতএব রায়ে কোনো সাজা হলে অবশ্যই তা আইনগত এবং রাজনৈতিকভাবেও মোকাবিলা করা হবে।’ 

মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলে আগামী নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র এই রাজনীতিবিদের অভিমত হলোÑ ‘সরকার যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে ভয় পায়, খালেদা জিয়াকে যেনতেনভাবে সাজা দেওয়া তারই বহিঃপ্রকাশ। তবে আদালতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে সমস্যা হবে না।’

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মামলার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক ও আইনগতÑ এ দুই ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। ওই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে যদি বিশেষ আদালতে খালেদা জিয়ার সাজা হয়, সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ আদালতে জামিন চেয়ে আবেদন করা হবে। এ ব্যাপারে সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি নেওয়া থাকবে। পাশাপাশি দ্রæততম সময়ের মধ্যে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে, যাতে নি¤œ আদালতে সাজা হলেও আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আইনগত কোনো বাধা না থাকে। অন্যদিকে খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ নেতাদের যদি সাজা হয়, সেক্ষেত্রে আইনি মোকাবিলার পাশাপাশি সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। স্বেচ্ছায় কারাবরণ, হরতাল-অবরোধসহ আইনজীবীদের টানা আদালত বর্জনের মতো কর্মসূচি নিয়ে দলটির মধ্যে আলোচনা হয়েছে। 

বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোও আলাদাভাবে বিষয়টি নিয়ে করণীয় ঠিক করতে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করেছে। বিএনপি ছাড়াও জোটের শরিকরাও এ ইস্যুতে রাজপথে নামার কথা ভাবছে। ২০ দলের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ইতোমধ্যে দলীয় এক সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জোট নেত্রী খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে নেওয়া হলে তারা স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবে। দেশের সাধারণ মানুষকে এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাবে দলটি। দল ও জোটের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। পেশাজীবীরা যাতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানায় সেই ব্যাপারে তাদের সঙ্গে শিগগিরই মতবিনিময় করা হতে পারে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবীব-উন-নবী খান সোহেল বলেন, ‘খালেদা জিয়ার নামে চলমান মামলাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সরকারের ইচ্ছাতেই খুব দ্রæত এসব মামলার রায় দিতে যাচ্ছে আদালত। সরকার নিম্ন আদালতের ওপর চাপ প্রয়োগ করে খালেদা জিয়াকে সাজা দিতে চায়। এরপর খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে এবং বিএনপির আন্দোলন দমনের নামে তারা দেশে একটি সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আবারও একতরফা নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু জনগণ আর এক তরফা নির্বাচন দেখতে চায় না। দেশের মানুষ আরেকটি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হজম করবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বিএনপি চেয়ারপারসনকে আদালতকে ব্যবহার করে সাজা দিয়ে নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না। এসব অপচেষ্টা বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রতিহত করবে। সেইসঙ্গে জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে এনে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।’

 বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমদ আযম খান বলেন, ‘সরকার নানা কারণে ভীত। আর এই ভয় তাড়াতে সরকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন মামলায় দ্রæত সাজা দেয়ার চেষ্টা করছে। চেয়ারপারসনের মামলাগুলোর কার্যক্রমও দ্রæত শেষ করা হচ্ছে। যাতে করে খালেদা জিয়াকে ও বিএনপিকে আগামী নির্বাচন থেকে দূরে রাখা যায়। এভাবে আওয়ামী লীগ আবারও একতরফা নির্বাচনের পথেই হাঁটছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের এ হীন ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। আইনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি তা প্রতিহত করবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, ‘জিয়া পরিবারকে বাইরে রেখে দেশে আর কোনো নির্বাচন হবে না। ম্যাডাম (খালেদা জিয়ার) সাজা হলে সেটি আইনিভাবে মোকাবিলা করা হবে। প্রয়োজনে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তাকে কারাগারে পাঠাতে হলে আমাদের লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যদি মনে করে থাকে খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে বিএনপির তৃতীয় সারির নেতাদের বা অতীতের সংস্কারবাদীদের নির্বাচনে এনে নির্বাচন করবে সেটা বুমেরাং হবে। এ ধরনের কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংস্কারবাদীদেরও প্রতিহত করা হবে। সেজন্য সারাদেশে তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

আজকালের খবর/এসএ



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com