শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭
রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের পথ আগলে আছে যেসব বাধা
পি কে বালাচন্দ্রন
Published : Tuesday, 14 November, 2017 at 4:01 PM

বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য জাতিসংঘ, পাশ্চাত্য এবং সেইসঙ্গে চীনের কাছ থেকে চাপ সৃষ্টির ফলে মিয়ানমারের অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন সামরিকসমর্থিত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আলোচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

এই আলোচনার ফলে ১০ দফার একটি সমঝোতার পথ সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ২৫ আগস্টের সর্বশেষ দফার সহিংসতার পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু চুক্তি সইয়ের কালি শুকাতে না শুকাতেই মিয়ানমার তা থেকে সরে গিয়ে প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদটি বাদ দিয়ে একটি সন্দেহজনক ‘যৌথ বিবৃতি’ ইস্যু করে।

স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির মুখপাত্র জাও হতে বলেন, মিয়ানমারে বাস করার সরকারি প্রমাণপত্র আছে, এমন উদ্বাস্তুদেরই কেবল মিয়ানমার গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, এই শর্ত ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে সই হওয়া চুক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের চুক্তিতে ফিরে যেতে রাজি নয়।

বাংলাদেশের ১৯৯২ সালে ফিরে না যাওয়ার পেছনে ভালো যুক্তি রয়েছে। চুক্তিটি ব্যাপকভিত্তিক নয়। প্রয়োজনীয় সরকারি নথিপত্র না থাকায় ওই সময় দুই লাখ উদ্বাস্তুর মধ্যে দুই হাজারেরও কম ফিরতে পেরেছিল। বেশিরভাগ উদ্বাস্তুর কাছে মিয়ানমারে বসবাস করার মতো কোনো নথিপত্র নেই। একদিকে মিয়ানমার তাদের তাদেরকে কোনো নথি দেয়নি, কিংবা দাঙ্গার সময় পালাতে গিয়ে তারা নথিপত্র হারিয়ে ফেলেছিল। বাংলাদেশ এসব উদ্বাস্তুকে ঠেলে বের করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সেটাও পারেনি।

বাংলাদেশের ১৯৯২ সালের চুক্তি গ্রহণ করতে অনীহা প্রদর্শনের ব্যাপারে মিয়ানমারের নিজস্ব যুক্তিও রয়েছে। সুচির মুখপাত্র জাও হতের মতে, রোহিঙ্গাদের জন্য বিশাল বিশাল উদ্বাস্তু ক্যাম্প বানিয়ে বেশি বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা লাভের জন্য বাংলাদেশ চায় উদ্বাস্তুরা যাতে থেকে যায়। মিয়ানমারের ওই মুখপাত্রের মতে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ৪০০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে এবং অব্যাহত উদ্বাস্তু উপস্থিতির উল্লেখ করে তারা আরো অর্থ চাচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশের সূত্রগুলো এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সরকারি আবাসন নথির শর্তের ওপর জোর দিলে ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তিটি বাস্তবায়ন হবে না। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী বসতি স্থাপনে তীব্র বিরোধী ঢাকা। উদ্বাস্তুদের জন্য স্থায়ী আবাসন নির্মাণে জাতিসংঘ উদ্বাস্তুবিষয়ক হাই কমিশনারের চেষ্টাও প্রতিরোধ করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী কক্সবাজারে বিদ্যমান ক্যাম্পগুলোর ঘিঞ্জি অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে আরো বেশি ক্যাম্প নির্মাণের বিদেশী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও অগ্রাহ্য করেছে বাংলাদেশ। স্থানীয় কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তাদের মতে, এমনটা করা হলে তাদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থার পথ খুলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত ১০ দফা চুক্তি থেকে মিয়ানমার সরে আসার পর মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাওয়ার প্রয়াস বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।

দুই পক্ষকে আলোচনায় সম্মত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে চীন। তবে তারাও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে চীন এখনো আশা করছে, ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের’ ধারণা প্রয়োগ করে পাশ্চাত্যÐনেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিরোধ করতে পারবে মিয়ানমার।

আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিরোধের জন্য মিয়ানমার সার্বভৌমত্বের ধারণাটি ব্যবহার করবে- এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মিয়ানমার বলছে, তারা এখনো দ্বীপক্ষীয় আলোচনা চায়। তারা বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গে এখনো আলোচনা চলছে। আলোচনার জন্য ১৬Ð১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মিয়ানমার যাবেন।

মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের যে বিরোধী তা ফুটে ওঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের যৌথ বিবৃতির ব্যাপারে তার প্রতিক্রিয়ায়। সুচির অফিস জানিয়েছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বাধাগ্রস্ত করবে।

বিবৃতিতে সার্বভৌম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির জন্য চীন ও রাশিয়ার প্রশংসা করা হয়। বাংলাদেশের আবেদনে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘ ও পাশ্চাত্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তবে তারা এমন কিছু করবে না যাতে সুচির সঙ্গে তাদের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। তাছাড়া তারা চীনকেও ঘাঁটাবে না। কারণ উত্তর কোরিয়ার হুমকি দমনে তাদের প্রয়োজন চীনা সহায়তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকালে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার আলোচনায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, চীনের সাথে মোলায়েম আচরণ করবে আমেরিকা।

আবার বাংলাদেশের প্রধান বিনিয়োগকারী এবং সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশ সরবরাহকারী চীন হওয়ায় এবং বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় চীন হওয়ায় এই দেশটির সমর্থন হারানোর ভয়ে একটি নির্দিষ্ট অবস্থার বাইরে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করবে না বাংলাদেশ। সমস্যাটির আন্তর্জাকিকরণ হয়ে গেলে জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার স্থায়ী বসতি স্থাপন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়ার ভয়ও আছে।

পাশ্চাত্যের মধ্যেও দ্বীধা রয়েছে। চীন ও রাশিয়ার ভেটোর শঙ্কায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কঠোর প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেনি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর মিয়ানমারের ঘটনাবলীকে ‘জাতি নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করতে অনীহা প্রদর্শন করেছে। কংগ্রেস মিয়ানমারে বিরুদ্ধে সামরিক অবরোধ আরোপ করতে চায় কিনা সে অপেক্ষায় আছে পররাষ্ট্র দফতর।

অবশ্য এশিয়া ইউরোপ মিটিং (আসেম)-এ এশিয়া ও ইউরোপের ৫৩টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ২০ ও ২১ নভেম্বর মিয়ানমারে সমবেত হবেন। তারা মিয়ানমার নেতাদের সাথে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবেন। এই সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ।

১৮ নভেম্বরের দিকে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ সম্মেনের আগে সুইডেন, জার্মানি, জাপান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকা আসবেন। তারা কক্সবাজারের উদ্বাস্তু শিবিরও পরিদর্শন করবেন।

ডেইলি এফটি থেকে


পি কে বালাচন্দ্রন: ভারতীয় সাংবাদিক


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com