শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭
আজ রাতে জোছনারা আসবেই
শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ
Published : Monday, 13 November, 2017 at 5:49 PM

কথা দিচ্ছি, আজ রাতেই জোছনার দেখা পাবেন। পঞ্জিকার হিসাবে আকাশ থেকে জোছনা ঝরার কথা নয়, তারপরও অনেকে ঠিক জোছনাকেই দেখবেন। চোখ থেকে জোছনা ঝরাবেন। যারা জোছনাবাদী, তারা পঞ্জিকার হিসাব মানতে বাধ্য নন। একটা অমাবশ্যা পেরিয়ে, কখন জোছনা আসবে, সেই অপেক্ষায় থাকেন না। এদের চোখে জোছনা ঢেলে দেওয়া হয়েছে। চোখের তারায় এঁকে দেওয়া হয়েছে হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি, মিসির আলীর মস্তিষ্ক। তাদের সঙ্গেই বেঁচে আছেন হুমায়ূন আহমেদ নামের এক রূপালি জোছনা। আজ তার জন্মদিন। আজ রাতে জোছনারা আসবেই।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে জোছনার শেষ দেখা আমেরিকার আকাশে। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমেরিকার সব কিছুই বিদেশি, কেবল চাঁদটা আমার বাংলাদেশের।’

ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশের আকাশে আবারও চাঁদ দেখার। বিশ্বাস ছিল সুস্থ হয়ে ফিরবেন। কিন্তু ২০১২ সালের ১৯ জুলাই তাকে বিদায় নিতে হলো আমেরিকার হাসপাতাল থেকেই। ক্যান্সার বাসা বেঁধেছিল শরীরে। ফিরে এসে ক্যান্সার হাসপাতাল বানানোরও স্বপ্ন দেখেছিলেন।

সবাই সব স্বপ্ন বাস্তবে দেখে যেতে পারেন না। হুমায়ূন আহমেদ পারেননি চাঁদনি পসর রাতের জন্য কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে। একটি বইয়ের মলাটে তিনি লিখেছিলেন ‘চাঁদনি পসর রাতে যেন আমার মরণ হয়’ গানটির কথা। লিখেছিলেন প্রবল জোছনার তোড়ে ভেসে যাওয়া কোনো রাতে যেন তার মৃত্যু হয়। জোছনা তার মধ্যে হাহাকার তৈরি করতো।

কিসের হাহাকার? বিশাল ক্যানভাস থেকেই কি এই হাহাকারের জন্ম? হাহাকার থেকেই তিনি ছুটে যেতেন হাহাকারের দিকে। লিখতেন, পড়তেন, ছবি আঁকতেন। কথা বলতেন কম। লোকের উপচেপড়া ভিড় অপছন্দ করতেন। তবে একেবারে নিঃসঙ্গও থাকতে চাইতেন না। বেড়াতে গেলে কাছের লোকজনকে সঙ্গে নিতেন। লেখায় যেমন, বলাতেও থাকতো রসিকতা। খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগতেন। মাটিতে বসে লিখতেই ছিল স্বাচ্ছন্দ্য।

নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের গুরুত্বটাই ছিল হুমায়ূন আহমেদের কাছে। পাছে লোকে কিছু বললেও তোয়াক্কা করতেন না। জীবনটা ছিল এক ধরনের অন্তরালের। তবে অন্তরালে থেকে তিনি পর্যবেক্ষণ করতেন। তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণগুলো খুব সহজেই তুলে আনতে পারতেন লেখায়। পর্যবেক্ষণ শুধু বাস্তবতায় হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কল্পনা নিয়েও তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। একটা মানুষের কল্পনা কতদূর পর্যন্ত দৌড়াতে পারে, তার তরল উপস্থাপনা তিনিই করেছেন।

হিমু, একটি হলদে কল্পনা। হুমায়ূন আহমেদের মস্তিষ্কের সৃষ্টি। মস্তিষ্কে এমন উদ্ভট ধারণা অনেকেরই আসতে পারে। কিন্তু ধারণার চিত্রগুলো হুবহু লেখায় এঁকে দিতে পেরেছেন বলেই তিনি হুমায়ূন আহমেদ। হলদে হিমুর বিপরীত চরিত্র মিসির আলী, যৌক্তিক এবং মোটেও উদ্ভটে বিশ্বাসী নন। তারপরও তিনি উদ্ভট।

হিমু ও মিসির আলীর মধ্যে হুমায়ূন কি নিজেকে রেখে গেছেন? এমন আরো অসংখ্য চরিত্রের সমন্বয়েই হুমায়ূন আহমেদ। অনেক কল্পনাকে করেছেন বাস্তব। বাস্তবকে উপস্থাপন করেছেন কল্পনার খোলসে। কিছু লোকাচার ও গানকে হুবহু ধরে এনে পর্দায় ছেড়ে দিয়েছেন। হাওর ও ভাটির লোকাচারকে ব্যাপক পরিচিতে এনে দিয়েছেন তিনিই। মস্তিষ্ক থেকে হুবহু কল্পনাগুলো লিখতে এবং লোকাচারকে হুবহু তুলে আনতে পেরেছেন বলেই মানুষের কাছে তাকে দুর্বোধ্য মনে হয়নি।

বেঁচে থাকতে তার সহজবোধ্যতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন অনেকেই। কিন্তু মৃত্যুর পর তারাও থেমে গেছেন। আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই শোকে বিহ্বল হয়ে যায় বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে তিনি বিশাল পাঠক তৈরি করেছেন। যারা পড়তে জানেন না, তারাও হুমায়ূনের নাটকের সঙ্গে পরিচিত।

প্রতি বছরই অপেক্ষা ছিল, হুমায়ূনের নতুন বই আসবে। পাঁচ বছর আগে এই অপেক্ষার সমাপ্তি হয়ে গেছে। নিউইয়র্ক থেকে আসা একটি খবরে হিমুর মৃত্যু হয়েছে। থমকে গেছে মিসির আলী। এই দুটি চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের কল্পনা করতে অভ্যস্ত ছিলেন তার পাঠক।

নিউইয়র্ক থেকে লাশ এলো। রাজধানীতে ঢল নামলো ভক্তদের। হলুদ পোশাকে ঢেকে গেল রাজধানী। গাজীপুরের বাগানবাড়ি নুহাশ পল্লীতে চলছিল শেষ আয়োজন। ওখানেও পাঠক-ভক্তদের ভিড়। জীবনের শেষ বছরগুলোতে ৯০ বিঘা জমির এই বাড়িতেই থাকতে পছন্দ করতেন তিনি। শেষ ঘুম তার এখানেই হলো।

হুমায়ূন আহমেদের লাশ সমাহিত করা হলো। কিন্তু তিনি সমাহিত হলেন না। হিমু ও মিসির আলী সেজে ছড়িয়ে আছেন গোটা বাংলাদেশে। ‘জোছনার আলোতে অনেক হিমু নুহাশ পল্লীর আশপাশে ঘুরঘুর করতো।’ বললেন নুহাশ পল্লীতেই কর্মরত মোশাররফ হোসাইন। হুমায়ূন আহমেদ থাকতেই তার নিয়োগ হয়েছিল। গাছ দেখাশুনা করা, টুকটাক কাজ করে দেওয়া, পাহারা দেওয়া তার দায়িত্ব। তিনি বললেন, ‘স্যারের মৃত্যুর পর হলুদ পাঞ্জাবি পরে পাগলের মতো ছুটে আসতো মানুষ। রাতে পল্লীতে ঢুকতে দেওয়া নিষেধ। কিন্তু পাশের জঙ্গলে খালি পায়ে হিমুরা হেঁটে বেড়াতো। এখনো আসে, হেঁটে বেড়ায়।’

‘হুমায়ূন স্যার আমাকে স্নেহ করতেন। ফুট-ফরমায়েসের আশায় আমি তৈরিই থাকতাম।’ এতটুকু বলে কাঁদতে শুরু করলেন মোশাররফ। এরপর অশ্রু মুছতে মুছতে গান ধরলেন, ‘কী ঘুম ঘুমাইয়া রইলি রে হুমায়ূন স্যার...’

নুহাশ পল্লীর সদর দরজার সামনে তিনি হাউমাও কান্নায় গাইলেন। এদিকে জোছনার তোড়ে ভেসে গেল নুহাশ পল্লী। হুমায়ূন আহমেদ কি এই জোছনার শব্দ শুনতে পেয়েছেন?


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com