বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭
আগ্নেয়াস্ত্র প্রতিযোগিতার অবসান হোক
রায়হান আহমেদ তপাদার
Published : Monday, 13 November, 2017 at 5:26 PM

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার নিক্ষিপ্ত দু’টি আণবিক বোমার বিস্ফোরণে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। লিটল বয় ও ফ্যাট ম্যান নামের বোমা দু’টির আঘাতে তাৎক্ষণিকভাবে মারা গিয়েছিল প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মানুষ এবং আয়নাইজিংয়ের ফলে ধীরে ধীরে আরো অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছিল। ৭২ বছর আগের লিটল বয় ও ফ্যাটম্যানরা এখন হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক। আর এদের সংখ্যাও এখন হাজার হাজার। তাই তো সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষের আবাস একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী আজ তার বুকে আশ্রিত প্রাণিক’লসহ ধ্বংসের আশঙ্কায় আর্তনাদ করছে, কিন্তু সে আর্তনাদ কী শুনতে পাচ্ছেন ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিশ্বমোড়ল দেশগুলোর ক্ষমতাধররা।

বিগত ২৬ অক্টোবর সামরিক মহড়া চলাকালে এক ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় রাশিয়া। শয়তান-২ বা আরএস-২৮ নামের এই ক্ষেপণাস্ত্র হিরোশিমায় নিক্ষেপিত মার্কিন আণবিক বোমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। আকাশে তিন হাজার ৮০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ৪০ মেগাটন ক্ষমতাসম্পন্ন এ ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে ১২টি নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেড যুক্ত করা সম্ভব। এক হামলায় পুরো যুক্তরাজ্য, টেক্সাস অথবা ফ্রান্স ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এই বোমার আঘাতে। রাশিয়ার এ মহড়ার প্রতিক্রিয়ায় গত ৩১ অক্টোবর মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড ও গেøাবাল থান্ডার নামে পারমাণবিক যুদ্ধ মহড়া শুরু করে। এ মহড়ায় পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম রোমারুবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া অনেক পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-কম্পনবিদ পল জি বলেন, রিচার্ডস সর্বশেষ পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর থেকে পাহাড়টিকে স্থানচ্যুত মনে হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ পারমাণবিক পরীক্ষার সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৬.৯ মাত্রার ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। এরপর ওই এলাকায় আরো তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আমরা উত্তর কোরিয়ার ভূমিতে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি।

একটি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে এত বড় মাত্রার ভূমিকম্প থেকে বোঝা যায় তা কি দানবীয় শক্তির বিস্ফোরক ছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংস ক্ষমতা যে কত ভয়াবহ তা অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন। বিগত ২০ অক্টোবর ওয়াশিংটন পোস্টে অ্যানা ফিল্ডের পারমাণবিক বোমার ছয়টি পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের পর উত্তর কোরিয়ার পাহাড় ক্লান্ত’ শীর্ষক অনলাইন প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়, ৭২০০ ফুট উচ্চতার চ’ড়াবিশিষ্ট ম্যানটাপ পাহাড়ের নিচে উত্তর কোরিয়া অনেক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এতে ম্যানটাপ পাহাড়টি ক্লান্ত পাহাড় উপসর্গ-এ আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। গত ১০ অক্টোবর এ পাহাড়ে সুড়ঙ্গ ধসে অন্তত ২০০ মানুষ নিহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইতোমধ্যেই খবর প্রকাশিত হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র এমন এক ধরনের যন্ত্র, যা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার প্রচÐ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করে। সে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ফিশনের ফলে অথবা ফিশন ও ফিউশন  উভয়েরই সংমিশ্রণেও সংঘটিত হতে পারে। উভয় বিক্রিয়ার কারণেই খুবই অল্প পরিমাণ পদার্থ থেকে বিশাল পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়।

এ ছাড়া এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, উত্তর কোরিয়া, ইসরাইলেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। গত ৩ জুলাই ২০১৭ জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচেভেলে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৯টি দেশের কাছে বর্তমানে ১৪৯৩৫টি আণবিক বোমা আছে।স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট সিপ্রি এর তথ্য অনুসারে রাশিয়ার কাছে বর্তমানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ৭০০০ আণবিক বোমা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক বোমা বানিয়েছে এবং একমাত্র দেশ, যারা এটা যুদ্ধে ব্যবহারও করেছে। দেশটির এখন ৬৮০০টি পারমাণবিক বোমা রয়েছে। ফ্রান্সের কাছে পারমাণবিক ওয়্যারহেড আছে তিন শ’র মতো। এগুলোর বেশিরভাগই রয়েছে সাবমেরিনে।

২৭০টি পারমাণবিক বোমা আছে চীনের। দেশটি ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বাড়াচ্ছে। ২১৫টি পারমাণবিক বোমা রয়েছে যুক্তরাজ্যের কাছে। ১৯৫২ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় বৃটেন। দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তানের আছে ১৩০ থেকে ১৪০টি আণবিক বোমা। সাম্প্রতিক সময়ে পারমাণবিক বোমার সংখ্যা বাড়িয়েছে দেশটি। অন্য দিকে ভারতের কাছে আণবিক বোমার সংখ্যা ১২০ থেকে ১৩০টি। ভারত প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় ১৯৭৪ সালে। ইসরাইলের কাছে দেশটির ৮০টির মতো পারমাণবিক ‘ওয়্যারহেড’ আছে বলে ধারণা করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০ থেকে ২০টির মতো পারমাণবিক বোমা রয়েছে। সম্প্রতি দেশটি শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালায়। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক আর্ম কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের (এসিএ) তথ্য অনুসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে বর্তমানে যে পরমাণু অস্ত্র মজুদ রয়েছে, তার বেশিরভাগই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে।

বিশ্বের ৯৩ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্র এ দুই দেশের হাতে রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার চেষ্টার জন্য চলতি বছর। অর্থাৎ ২০১৭ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস- আইসিএএন। আইসিএএনের চেষ্টা ও চাপে গত জুলাই মাসে জাতিসংঘের ১২২টি সদস্য দেশ পরমাণু অস্ত্রনিরোধ চুক্তির পক্ষে সমর্থন দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ পারমাণবিক অস্ত্রধারী ৯টি দেশ তাতে সাড়া দেয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস (আইসিএএন)-এর দেওয়া তথ্যানুসারে, আরো প্রায় ৪০টি দেশ ক্রমাগত পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো এখনো নতুন নতুন পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে এবং অন্য যেসব রাষ্ট্র এই বোমা বানানোর চেষ্টা করছে, তাদের নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। কিন্তু মানবিকতা বিবর্জিত রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি আর টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতিতে কতদিন এভাবে এই পৃথিবীকে ১৬ হাজার পরমাণু বোমার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।

টেলিগ্রাফের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্মিলিতভাবে যে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তার ধ্বংসক্ষমতা ছয় হাজার ৬০০ মেগাটন। সারা বিশ্ব প্রতি মিনিটে যে পরিমাণ সৌরশক্তি গ্রহণ করে তার ১০ ভাগের এক ভাগ রয়েছে ওই পারমাণবিক অস্ত্রের। নিউকম্যাপ ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, মার্কিন অস্ত্রাগারে সবচেয়ে ক্ষমতাসম্পন্ন বড় যে বোমা, তার নাম বি-৮৩। এটি প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ১৪ লাখ লোক হত্যার ক্ষমতা রাখে। এ ছাড়া তাপ বিকিরণে আহত হবে ৩৭ লাখ মানুষ। এই বোমার বিকিরণ ছড়াবে ১৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধজুড়ে।

অনুরূপভাবে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় টাসার বোমা যেটি ইউএসএসআর নামে পরিচিত। এটি নিউ ইয়র্কে আঘাত হানতে সক্ষম। ধারণা করা হয়, এটি ৭৬ লাখ মানুষ হত্যা করতে পারে এবং ৪২ লাখেরও বেশি মানুষকে আহত করতে সক্ষম। এটি বিকিরণ ছড়াবে প্রায় সাত হাজার ৮৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে; যার প্রভাব পড়বে কোটি কোটি মানুষের ওপর। ধ্বংসের আশঙ্কায় কম্পমান পৃথিবীকে, পৃথিবীর সব প্রাণী ও মানব জাতিকে বাঁচাতে হলে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন্ধ করতে হবে।

পারমাণবিক শক্তিধর সব দেশকে পরমাণু অস্ত্র নিরোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করতে হবে পারমাণবিক অস্ত্রের সব মজুদ। গড়ে তুলতে হবে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব। পারমাণবিক অস্ত্রের আঘাতে যেকোনো সময় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পুরো পৃথিবী। বর্তমানে বিশ্বে যে পরিমাণ পরমাণু বোমা মজুদ আছে, তা দিয়ে ৩৮টি পৃথিবীকে পুরোপুরি ধ্বংস করা যাবে বলে জানিয়েছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এখন বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা এমন সর্বনাশা প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক।

রায়হান আহমেদ তপাদার: বৃটেন প্রবাসী কলাম লেখক।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com