বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭
দাবি
সাইফুল ইসলাম জুয়েল
Published : Friday, 6 October, 2017 at 4:27 PM

`কী হলো? এভাবে হঠাৎ গাড়ি থামালে যে?’ প্রশ্ন নয়, বলতে গেলে প্রায় ঝাড়ি মেরেই কথাটা বলল তমালিকা।
তীব্র গতিতে চলতে থাকা গাড়িটাতে হঠাৎ করেই ব্রেক কষেছি আমি। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির মধ্যে ভূ-কম্পন শুরু হয়ে গেল। গাড়ির বডির সঙ্গে ধাক্কা খেতে লাগলাম। আমাদের দু’জনের মাথাও ঠোকঠুকি করল বার কয়েক।
পরের ঝাক্কিটা এলো তমালিকার তরফ থেকে। ‘আরে, কী হলো? কথা বলছো না কেন? বলবে তো কী হলো? ফাঁকা রাস্তার মাঝে এভাবে হঠাৎ ব্রেক কষার কী হলো? আমার কথার জবাব দিচ্ছো না কেন? হঠাৎ পুরাতন কোনো প্রেমিকার কথা মনে পড়ে গেছিল, তাই না? নাকি প্ল্যান করেছিলেন আমাকে নিয়েই আত্মহত্যা করবে?
তমালিকা একটানা বকবকর করেই চলেছে। কিন্তু আমি নিশ্চুপ। ওকে কী বলব আমি? সেসব কথা কি বলা যায়? আর বললেও, ও কি তা বিশ্বাস করবে?
উত্তেজনা আর অজানা ভয়ে আমি ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছি প্রায়। অথচ আজ সন্ধ্যাটা আমার জন্য কতোই না রোমাঞ্চকর ছিল।
লেখালেখির কৃতিত্বে আজ একটা বড় পুরস্কার পেয়েছি। বিশাল সম্বর্ধনা দিয়েছে আয়োজকরা আমায়। টাউন হলের অডিটরিয়ামটা কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। দেশের সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেল তাদের ক্যামেরাম্যান পাঠিয়েছে। প্রিন্ট মিডিয়ার লোকজন তো ছিলই। দেশের বরেণ্য লেখকগণ আমাকে ক্রেস্ট, উত্তরীয়, সম্মানী চেক তুলে দিয়েছেন। স্টেজ থেকে নামা মাত্রই দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রকাশনীর সত্ত¡াধিকারীরা আগামীতে আমার বই করতে স্বতস্ফূর্ত আগ্রহ প্রকাশ করলেন। জানালেন, চুক্তি সম্পাদন করতে শিগগিরই আমার বাড়িতে আসছেন তারা। তবে, সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্বটা মঞ্চস্থ হলো এর পর। অনুষ্ঠান শেষে, তমালিকা আমার কাছে এসে নিজে থেকেই তার আগ্রহের কথাটা প্রকাশ করল। আমি অনেক আগেই তাকে প্রপোজ করেছিলাম। এতকাল ঝুলে থাকা সম্পর্কটা অবেশেষে আজ একটা গতি পেল।
অনুষ্ঠান শেষে সম্পর্কের নতুন শুরুটা এনজয় করতে দু’জনে গাতিতে লং ড্রাইভে বেরিয়েছিলাম। ভীষণ খুশী আমি। জীবনে এত বড় সম্মাননা। তারওপরে তমালিকা...। মহাসড়কে এই সুনশান পথে দু’জনে বেশ রোমান্সকর অবস্থাতেই পৌঁছে গিয়েছিলাম। পেটে ড্রিঙ্কসটা বোধহয় একটু বেশিই পড়ে গেছে। হঠাৎ সড়কের মাঝখানে সেই লোকটাকে দেখলাম। অমনি বুকের ভেতরটা ধরফর করে উঠলো। মাথা গেল গুলিয়ে। প্রচণ্ড গতিতে চলতে থাকা গাড়ির হার্ডব্রেক কষে বসলাম। দ্রুত দরজা খুলে বাইরে বেরুলাম। সামনে তাকানো মাত্রই অবাক। সামনের সড়কটা যেন খাঁ খাঁ করছে। কেউ নেই। কেউ কোথাও ছিলও না। অবশ্য থাকবার কথাও নয়।
একটু আগে যাকে দেখলাম, তাকে তো আমি... থাক, সে কথা আর বলতে চাইছি না। তমালিকা ক্ষেপে গেছে। ওকে ঠাÐা করতে হবে। সেটা যে ব্যাপক ঝাক্কির কাজ, তা তো বুঝতেই পারছেন!

ওই দিনের পরে আরও সপ্তাহ খানেক সময় কেটে গেছে। ঘটনাটিকে প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। অবশ্য সেটা সহজ কাজ ছিল না। পরে, মনকে বুঝ দিলাম-এটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য। তার ওখানে থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আমি ভুল দেখেছি।
কিন্তু আজ আবার সেই লোকের দেখা পেলাম।
সারাটা বিকাল বাইরে ছিলাম। ইদানীং তমালিকাকে অনেক বেশি সময় দিতে হচ্ছে। প্রেম হবার আগেই তো বেশ ছিলাম! এখন যেন মেয়েটির ডিম্যান্ড আরও বেড়ে গেছে। অথচ আমি জানি, ঝুলে পড়ার আগ পর্যন্তই মেয়েদের ডিম্যান্ড বেশি থাকে। তারা প্রেমে হ্যাং হয়ে গেলে বরং, প্রেমিক মশাইর অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে!
গাড়িটাকে কেবল গেটের সামনে এনে ¯েøা করেছি। হর্ন বাজানোর পর মূল গেট খুলতে দারোয়ানের একটু সময় লাগে। সে সময়ে পকেট গেট থেকে বেরিয়ে যেতে দেখলাম লোকটাকে! সেদিন মহাসড়কে দেখা সেই লোকটা। এ আমার বাসার ভেতরে কী করছিল? তাকে বেরোতে দেখে আমিও গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দ্রæত বেরিয়ে এলাম। কিন্তু আলো-ছায়ায় লোকটা যে কোথায় হারালো!
রুমে ঢুক ফ্রিজ থেকে ঠাÐা পানির বোতল বের করে ঢকঢক করে পুরোটা গিলে ফেললাম। তবুও গলা ভিজলো না। অন্যদিকে, এসি চলা সত্তে¡ও দরদরিয়ে ঘামছি আমি।
আরেকদিনের ঘটনা।
বাইর থেকে বাসায় ফিরে বাথরুম ঢুকে ফ্রেশ হয়ে এসে ল্যাপটপ ওপেন করে আমার ‘লিখনী টেবিলে’ বসলাম। এই টেবিলে বসে কতো কতো লেখা যে বেরিয়ে এসেছে। সে সব লেখার জন্য আজ এই তরুণ বয়সেই আমি লেখক সমাজে প্রতিষ্ঠিত।
হঠাৎ পেছনে খাটের দিকে তাকানো মাত্রই চমকে উঠলাম। কেউ একজন বসে আছে ওখানে। হ্যাঁ, স্বশরীরেই বসে আছে লোকটা। আমার চোখদুটো বড় ও গোল গোল হয়ে গেল। এ এখানে এলো কী করে। একটু আগেও যখন বাথরুম থেকে বেরুলাম, তখন কেউ ছিল না ওখানে। আমি এখানে বসার পর কেউ রুমে ঢোকেনি। দরজাও ভেতর থেকে ভেজানো।
শরীর বাঁকিয়ে তার দিকে ফিরলাম। ভালো করে দেখলাম লোকটাকে। সম্প্রতি আমি তাকে আরও দুবার দেখেছি। আজ এ নিয়ে তৃতীয়বার। কিন্তু আমি জানি, এই তিনটিবারের একটিবারও দেখা হওয়া সম্ভব নয় তার সাথে আমার। আজ অবশ্য একটু শান্তনা আছে। আগের দু’বার আমার চোখের সামনে দিয়ে উধাও হয়ে গেলেও আজ আর সেটা হতে দিচ্ছি না। আমি চোখে চোখে রাখব।
বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছি লোকটাকে। হ্যাঁ, সেই একই লোক। এত বছরে বয়স একটু বেড়েছে বটে, তবে তাকে চিনতে কোনো সমস্যা হয়নি আমার। না, ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু... তার এখানে এভাবে বসে থাকা তো অসম্ভব, অবাস্তব, অলৌকিক!
লোকটা এতক্ষণ চুপচাপ নিজের হাঁটুর দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার সোজা আমার চোখের দিকে তাকালো।
‘চিনতে পেরছেন?’ মুখে তার এক চিলতে হাসি।
আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। ‘কিচ-কিচ’ আওয়াজ হলো শুধু।
‘আপনি যাতে আমাকে চিনতে পারেন, সেজন্য কম কসরত হয়নি আমার।’
আমি বলতে চাইলাম, ‘যেমন?’ কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজই বেরুলো না।
‘আজ আসার ডেটটা আমি অনেক আগেই ফাইনাল করে রেখেছিলাম। রোজ রোজ তো আর আসা যায় না।’ বলে একটু হাসার অভিনয় করল। ‘আর, এখানে আসা-মাত্রই আপনি যাতে আমাকে চিনতে পারেন, অতীতের সবকিছু মনে করতে পারেন, সেজন্য দু’বার ট্রায়াল দিয়েছিলাম। মানে, অতি অল্প সময়ের জন্য আপনার সামনে এসেছিলাম। সেটা না করে, আজ হঠাৎ হাজিরা দিলে, আপনি তো বলেও ফেলতে পারতেন, ‘কে হে বাপু তুমি? তোমায় কভু দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না? এভাবে রুমের মধ্যে ঢুকে বসে থাকার সাহসই বা পেলে কী করে? যাও, ভাগো এখান থেকে, যত্তসব পাগল-ছাগল!’ আমি মানুষটা ছোট হতে পারি। কিন্তু ন্যূনতম আত্মসম্মানবোধ তো আছে। সে জন্যই যথাসম্মানে এখানে এসে হাজির হলাম।’
একটানা অনেক কথা বলে থামল লোকটা। কিন্তু আমার মাথায় কোনো কিছুই কাজ করছে না। আসলে এতক্ষণ ভয়েই কোনো কথা বলতে পারিনি আমি। কারো সামনে তার কোনো পরিচিত মৃত মানুষের আত্মা বসে থাকলে, তার কেমনটা লাগতে পারে? তাও যদি সেই লোকের খুনি স্বয়ং...
আমাকে এভাবে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে সে আরেকবার মুচকি করে হাসল। ‘আপনি কিছু বলবেন? বেশ তো, বলুন না। জানেন, সেই কতদূর থেকে কেবল আপনার কথা শোনার জন্যই এখানে এসেছি।’
এবারে আমার মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরুলো। ধমক দেওয়ার চেষ্টা করলাম। ‘কী- কী চাই আপনার?’
‘তেমন কিছু না। একখানা দাবি নিয়ে এসেছি।’
‘দাবি? কিসের দাবি? তখন তো আপনার কোনো দাবি-দাওয়া ছিল না।’
‘জি আজ্ঞে।’ বলে দু’হাতের আঙুল দিয়ে আনমনে খেলা করতে লাগল সে। ‘কিন্তু আমি যে কোনো দাবি তুলতে পারব না, এমনও তো কোনো শর্ত ছিল না, তাই না?’
‘বলুন, কী দাবি আপনার?’
‘আমার লেখাগুলোর দাবি। ওগুলো আমি এখন আমার নিজের নামে প্রকাশ করতে চাই।’
‘বেশ তো, করুন না। পাবলিক আপনাকে লেখা চোর হিসেবে সাব্যস্ত করতে বিন্দুমাত্র দেরী করবে না।’
‘হাহ!’ শ্রাগ করল লোকটা। ‘আমার লেখার আমিই চোর? অদ্ভুত কথা শোনালেন তো আপনি। পাবলিকের কথা বাদ দিন। আপনি তো জানেন-কে আসল চোর?’
‘এখানে চোরের কী হলো?’ ভীষণ ক্ষেপে গেলাম আমি। ‘সত্যি করে বলুন তোÑআমি কি তখন আপনার কাছে গিয়েছিলাম? নাকি আপনি নিজেই এসেছিলেন? এসে সে-কী কান্নাকাটি। বললেন, আপনার লেখাগুলো আমি যাতে আমার নিজের নামে চালিয়ে দিই। লেখক হিসেবে কেউ আপনাকে দাম দিচ্ছে না। কেউ আপনার লেখাগুলো পড়েও দেখছে না। দু’একজন এক দু’লাইন পড়ে পাÐুলিপি মুখের ওপরে ছুড়ে মেরে বলেছে, ‘এসব কী ছাইপাশ লিখেছেন? যান তো এখান থেকে। আমাদের অনেক কাজ পড়ে আছে।’ তখন আপনিই ঠিক করলেন, আপনার লেখার যে আসলেই কদর আছে, তা পরখ করে দেখতে চান। সে কারণে যাবতীয় লেখা আমাকে দিয়ে দিলেন। লেখাগুলো আমি পত্রিকার সম্পাদক বরাবর পাঠালে ওরা দু’বার না ভেবেই ছাপবে, এমনটাই বিশ্বাস ছিল আপনার। তখন আপনিই বুঝে নিবেন, আসলেই আপনার লেখার মধ্যে কিছু আছে। কিন্তু এই সমাজ আপনাকে পাত্তা দিলো না। আপনার কদর বুঝলো না, এই যা। লেখালেখির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ভেবেছিলেন, এমন মুখচেনা, পক্ষপাতে দুষ্ট সমাজে লেখালেখি করে কী লাভ! সে কারণে দূরে কোথাও চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু...’
‘কিন্তু কী?’ প্রশ্নটা করে আবারও মিটিমিটি হাসতে লাগল লোকটা।
‘আবার কী? আমি তো আপনার লেখা ‘নিবো না’ বলেই দিয়েছিলাম। কিন্তু নাছোড়বান্দা আপনি শেষমেশ আমাকে দিয়ে আমার নামেই লেখাগুলো পত্রিকার সম্পাদকের দফতরে পাঠাতে বাধ্য করেছিলেন।’
আমি এ পর্যন্ত বলে চুপ করে রইলাম। লোকটার পেটে কী আছে, তা জানা দরকার।
‘হুমম...’ মুখ খুলল সে। ‘এখন পর্যন্ত আপনি যা যা বলেছেন, সবই সত্য। তখন আমিও ভেবেছিলাম, কী হবে লেখালেখি করে। কেবল আমার লেখার মানদÐটা যাচাই করতে চেয়েছিলাম। আসলে, মনে বেশ জেদ চেপে বসেছিল। আমি যে ছাইপাশ লিখি না, তা যাচাই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার লেখাগুলো যে আপনাকে...’ একটু থামল লোকটা। ‘ওগুলো যে আপনাকে এতটা উপরে ওঠাবে তা কল্পনাও করতে পারিনি। আমার একটা উপন্যাস দিয়ে তো আপনি কী যেন একটা বড় পুরস্কারও বাগিয়ে নিলেন। অথচ, সে সব কিছু আমারই পাওনা ছিল।’
আমি জানতে চাইলাম, ‘এখানে আমার কি কোনো দোষ আছে?’
‘আপনার দোষ?’ এক মুহূর্ত ভাবল লোকটা। ‘না, এতে আপনার কোনো দোষ নেই। সে জন্যই তো আপনার কাছে এসেছি। এবার আপনি আমার লেখার সত্ব’র বিষয়টা লোকজনকে জানাবেন। আমি চাই-আমার লেখাগুলো পাঠক আমার নামেই পড়–ক।’
‘সে তো সম্ভব না। আমি আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। এখন এমন খবর বাজারে বেরোলে আমি ধূলিসাৎ হয়ে যাব।’
‘সেটা না করলেও আপনি ধূলিসাৎ হবেন।’
লোটার কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল, আমার শিরদাড়া বেয়ে শিরশিরে কী এক অনুভূতি প্রবাহিত হয়ে গেল। ‘উহু, বললেই হলো! কীভাবে করবেন আপনি আমার ক্ষতি?’ যদিও আমি জানি, এর পক্ষে সব কিছুই করা সম্ভব!
‘আপনি আমার খুনি। আমাকে খুন করেছেন আপনি।’ কথাটা বেশ শান্ত স্বরে বলল সে।
মুহূর্তেই চমকে উঠলাম আমি। যদিও আমি জানতামÑএতক্ষণ ধরে আমি কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং একজন স্বল্প পরিচিত মানুষের আত্মার সাথেই কথা বলেছি। তবুও সে খুনের কথা তোলায় না ভরকে পারলাম না।
সে আবারও বলল, ‘আমার দাবি না মানলে পাবলিক সব কিছু জেনে যাবে। আজ থেকে ৭ বছর আগে আপনি ভবেশ ঠাকুর নামে এক সম্ভাবনাময় লেখককে গাড়িধাক্কা দিয়ে মেরেছেন। আপনি... আপনি একট খুনী!’
‘তখন আপনি বলেছিলেন, আপনি এ শহর ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু গেলেন না কেন?’
‘আমার প্রতিটা লেখাই আমার সন্তানের মতো। চলে যাওয়ার প্রস্তুতিই নিচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলোÑএকটিবার ফলাফলটা দেখে যাই। তাহলে অন্তত মনে তো সুখ পাব। কিন্তু দেখলাম, ওই লেখা আপনাকে দ্রæত উপরে তুলছে। তাই, সত্যিকথা বলতে দোষ নেই, আপনার খ্যাতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলাম আমি। শহর ছেড়ে চলে যেতে পারিনি।’
‘সে কারণেই তো আপনাকে সরিয়ে দিতে হলো।’
‘বুঝলাম। তা এখন কোনটা করবেন?’ সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল সে। ‘আমার লেখার মালিকানার কথা পাঠকের কাছে স্বীকার করবেন, নাকি আমাকে খুন করার কথা পুলিশের কাছে গিয়ে খুলে বলবেন? এ দুটোর বাইরে আপনার আর কোনো কিছুই করার উপায় নাই। এবার আমি পুরো শক্তি নিয়েই ওপাড় থেকে এসেছি। জানেন তোÑমানুষের পক্ষে যা কিছু অসম্ভব, আমাদের পক্ষে তা একেবারে ডাল-ভাত। এবার আপনাকে ধ্বংস না করে ছাড়ছি না।’
ইতোমধ্যে আমার কলজে শুকিয়ে গেছে প্রায়। এভাবে প্যাঁচিয়ে যাব, তা ভাবতেও পারিনি। কিন্তু... আমাকে এভাবে গ্যাঁড়াকলে ফেলে লোকটার কী লাভ?
‘আপনাকে আমি পাঁচ দিন সময় দিয়ে গেলাম। মনে রাখবেন, পাঁচদিন মানে পাঁচদিনই। এর মধ্যে কিছু একটা পদক্ষেপ চাই।’ এই বলে লোকটা আমাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু সে দরজা পর্যন্ত যাবার আগেই ভ্যানিশ হয়ে গেল!
থ মেরে বসে রইলাম। মাথায় কোনো কিছু কাজ করছে না। মাথাটা ভনভন করছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা দেখছি। মাথায় কতগুলো প্রশ্ন ভাসছে।
 লোকটা কী উদ্দেশ্যে আমাকে এভাবে বরবাদ করে দেবে? পর জগতে থেকে খ্যাতির প্রতি তার কেন এত লোভ? প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে পড়েছে সে, আমাকে কি রেহাই দেবে? আমার সব কিছুই যে আশু ধ্বংস হতে চলেছে! মান-সম্মান কোনো কিছুই আর অক্ষত থাকবে না। এই বিশাল ধন-সম্পত্তি, এতদিন ধরে যা অর্জন করেছি, তা কে খাবে? প্রেম... তমালিকা... সেও কি আমায় ছেড়ে চলে যাবে? কেহই কি আমার পাশে থাকবে না? কী করণীয় আমার? কনফেশন? নাকি আত্মহত্যা?
লোকটার লেখক মালিকানা আমি দেবো না। তা দিলে মুহূর্তের মধ্যেই সে নাম-ধাম অর্জন করে ফেলবে। আমাকে পথে বসিয়ে নিজেই বড় লেখক বনে যাবে সে। অথচ, আমি তো শুধু তার লেখা দিয়েই বড় হইনি। আমার নিজেরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে পাঠককে। কিন্তু পাবলিক সেটা বুঝতে চাইবে না তখন।
তাকে খুন করার স্বীকারোক্তিও পুলিশের কাছে বলা যাবে না। খুনী হিসেবে সমাজে বেঁচে থাকতে চাই না আমি। চাই না জেলের ঘানি টানতে, কিংবা ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলে মরতে। আমি মরে গেলেও মানুষের ছিঃ ছিঃ তো আর খামবে না।
তাহলে, এখন উপায়... আত্মহত্যা!
হ্যাঁ, সেটাই বরং ভালো হবে। একমাত্র এটা হলেই, সেও আর লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে না। যেহেতু সে মৃত, নতুন কিছু লেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়, অন্যদিকে আগের লেখাগুলো আমার নামেই থেকে যাবে। পুলিশও জানবে না, তাকে আমার খুন করার কথাটা।


২.
লেখক অনিন্দ্য বাগচীর বাসা থেকে বেরিয়ে একবার পিছু ফিরে চাইল লেখক ভবেশ ঠাকুর। না, কেউ পিছু লাগেনি। অনিন্দ্য বাগচী বিন্দুমাত্রও সন্দেহ করেনি। একটু আড়ালে গিয়েই হো হো করে হেসে ফেলল সে।
কতো চমৎকার একটা ফন্দি এঁটেছে সে। অনিন্দ্য বাগচীর লেখক সুখ্যাতিকে নিজের দখলে নেওয়ার প্ল্যান তার। এতদিন এ জন্যই অপেক্ষা করেছে সে। অনিন্দ্য বাগচী এমনিতেই খুব ভাল লিখে। লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে ভবেশ ঠাকুরের লেখাগুলো তার নিজের নামে না চালালেও চলত। তবে, তাতে হয়ত আরও কয়েকটা বছর বিলম্ব হতো, এই যা।
অনিন্দ্য বাগচী সেদিন আসলেই ভবেশ ঠাকুরকে মারতে চেয়েছিল। সেটা আজ থেকে সাত বছর আগেকার ঘটনা। সেদিন অনিন্দ্য বাগচী তার লেখক-বন্ধু অনিতা রয়কে নিয়ে পাহাড়ের দিকে বেড়াতে যায়। জায়গাটা শহর থেকে একটু দূরে। যেতে যেতে সন্ধ্যা নেমে আসে প্রকৃতিতে। আলো-আধারির খেলা শুরু হয়ে গেছে। একটা চায়ের দোকান রয়েছে ওখানে। অনিতা চা খাবার কথা বলে সেদিকে চলে গেল। অন্যদিকে, প্রকৃতির চাপ পেলে অনিন্দ্য বাগচী একটু দূরে সরে আসে। হঠাৎ করেই সে ভবেশ ঠাকুরকে দেখতে পেল। পাহাড়ের কিনারে একটা পাথরের উপরে একাকী বসে আছে অবেহেলিত-জেদী লেখকটি। অনিন্দ্য একটু আগেই পরিকল্পনা করেছিল, ভবেশকে আর এই পৃথিবীতে রাখা যাবে না। যার লেখা তাকে এত সহজে উপরে টেনে তুলছে, তাকে চিরতরেই সবার থেকে আড়াল করতে হবে। তখন নিশ্চুপে গাড়িটা দিয়ে সে ভবেশকে পেছনে দিক থেকে ধাক্কা মারে। ভবেশের দেহটা দূর পাহাড়ে ছিটকে পড়ে। যার নিচ দিয়ে ¯্রােততর পাথুরে কৃষ্ণা নদী বয়ে গেছে। অনিন্দ্য নিশ্চিত হয়Ñভবেশের দেহটা একেবারে ছাতু হয়ে গেছে।
ফিরে এলো সে। অনিতা একাগ্রচিত্তে চা খাচ্ছে। তাকেও চা অফার করল। অনিন্দ্য চা হাতে নিলেও স্বাভাবিক হতে পারছিল না। চায়ের কাপটা রেখে অনিতাকে নিয়ে ঝটপট জায়গাটা ত্যাগ করল সে।

সেদিনের কথা মনে করতেই হো হো করে একচোট হেসে নিল ভবেশ ঠাকুর। এর যে পুরোটাই তার প্ল্যান ছিল, অদ্যাবধি অনিন্দ্য বাগচী তা ঘুর্ণাক্ষরেও টের পায়নি। অনিতা রয়, তার বন্ধু। বন্ধু বললেও অবশ্য ভুল হবে। ছোটবেলার প্রেমিকা। নিজের লেখা দিয়ে ভবেশ ঠাকুর অনিতাকে লেখক বানিয়েছে। সেটা অবশ্য অনিন্দ্য বাগচী তার লেখা দিয়ে সুখ্যাতি পাওয়ার পর। লেখার সূত্র ধরেই অনিতার আগ্রহে তার সাথে অনিন্দ্যর বন্ধুত্ব জমে। তারপর, ভবেশের প্ল্যানমাফিক সেই রাতে অনিতা ড্রিঙ্কসের মধ্যে নেশা জাতীয় পদার্থ মিশিয়ে অনিন্দ্যকে ভবেশকে খুন করতে উদ্বুদ্ধ করে। নিজেই তাকে ওই পাহাড়ে নিয়ে যায়। যেখানে, আগেই ওই পাথরের ওপরে ভবেশ তার ডামি বসিয়ে রাখে। অনিতা নিজে চা খাওয়ার কথা বলে সরে পরে। সে রাতে অনিন্দ্য বাগচী কেবল তাদের দু’জনের ক্রিড়ানক হিসেবেই কাজ করে যায়।
তারপর টানা এতটা বছর তারা দু’জনেই আড়ালে চলে যায়। এক সাথেই থেকেছে দু’জনে। ৭ বছর আগে অনিতা অনিন্দ্য’র একটা ক্ষুদ্র দোষ ধরে তার কাছ থেকে দূরে চলে যায়। অনিন্দ্য আর কখনো অনিতার খোঁজ পায়নি।
হয়ত পাবেও না। এখানে আসার আগে, ভবেশ হত্যাকাÐের একমাত্র সাক্ষীকে যে ভবেশ নিজ হাতেই খুন করে এসেছে!
মনটা খুশীতে ভরে আছে ভবেশের। আজ অনিন্দ্যকে পুরোপুরি টোপে গেলাতে পেরেছে সে। এখন সেই টোপ মতো মাছটাকে নিজের জালে আটকানোর পালা তার। প্রথমদিন সে মহাসড়কের ঠিক মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে অনিন্দ্যকে চমকে দিয়েছিল। অনিন্দ্য গাড়ি থেকে বেরুনোর পূর্বেই সে সটকে পড়ে। দ্বিতীয় দিন গিয়েছিল অনিলের বাড়ির কোনো একজন লোককে নিজের দলে টেনে নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। সে অনিন্দ্যকে দেখা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ঠিক ওই সময়ে বেরোয়। তৃতীয় দিন সে অনিলের বাড়ির সেই লোকটির সাহায্যে বাইর থেকে চাবি দিয়ে দরজা খোলে। চুপচাপ ভেতরে ঢুকে অনিলের পেছনে বসে থাকে। অনিলের সঙ্গে কথা বলে বেরুনোর সময় কাজের লোকটি হালকা নেশাদ্রব্য মিশ্রিত ধোঁয়া ছড়ায়। সেই সুযোগে সে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। নেশাটা অনিলের মস্তিষ্ককে ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে দেয়। সে কারণে, তখন সে ভবেশের পিছুও নিতে পারেনি। ভবেশ জানেÑঅনিলের মনে আজ পুরোপুরিই এই ধারণা জন্মে গেছে যে, ওটা ভবেশের আত্মা বৈ আর কিচ্ছু নয়।
ভবেশ জানে, অনিন্দ্য কখনো তার খুনের কথা স্বীকার করবে না। তাহলে যে তাকেও ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হবে। এখন অনিলের একমাত্র উপায়-ভবেশকে জাতে তোলা, অর্থাৎ লেখার স্বীকৃতি দিয়ে তাকে একদিনেই প্রতিষ্ঠিত লেখক বানিয়ে দেওয়া!
নিজের লেখার হাতের মতোই, ভবেশের পরিকল্পনাটিও ছিল একেবারে ঠাঁসা। সবকিছু যে ভবেশের পাকা চিত্রনাট্য অনুযায়ীই হচ্ছিল...
কিন্তু ভবেশ কল্পনাও করতে পারেনি, তার সমস্ত আশার গুঁড়েবালি হতে চলেছে। ইতোমধ্যেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে অনিন্দ্য। অন্যদিকে, অনিতা রয়ের খুনী ভবেশ ঠাকুরকে হণ্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে পুলিশ।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com