রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭
‘বাংলাদেশ সাহায্য না করলে রোহিঙ্গারা ধ্বংস হয়ে যেতো’
অনলাইন ডেস্ক
Published : Tuesday, 5 September, 2017 at 1:42 PM

মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত প্রফেসর ইয়ানঘি লি বলেছেন ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে চলা সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের দি হিন্দু পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: চলমান সহিংসতায় ঘরবাড়ি হারিয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা কত হবে?
উত্তর: গত শুক্রবার [১ সেপ্টেম্বর] আমাকে বলা হয়েছে ৩০,০০০ মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, প্রায় ২০ হাজার এখনো প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। এরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে আটকা পড়ে আছে।( এখন এ সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে)

প্রশ্ন: নাকি নদীতে ভাসছে?
উত্তর: হ্যাঁ নদী ও আশপাশের পাহাড়ে; সবমিলিয়ে ৫০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে। তবে এখন আমি আরো বেশি সংখ্যক মানুষ বাস্তচ্যুত হওয়ার খবর পাচ্ছি। তবে, সংখ্যা যাচাই করা সহজ নয়।

প্রশ্ন: তাহলে সংখ্যাটি অনেক বেশি হবে?
উত্তর: হ্যাঁ। ২০১৬ সালের অক্টোবরের ঘটনায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার মানুষ ২-৩ মাসের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আর এখন এক সপ্তাহের মধ্যে ৫০ হাজার বাস্তচ্যুত হয়েছে। সম্ভবত এটাই মিয়ানমারে এ যাবতকালের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি।

প্রশ্ন: সহিংসতায় কতজন মারা গেছে?
উত্তর: ২৫ আগস্টের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৪-১৫ জন সদস্য নিহতের কথা আমরা জানতে পেরেছি। মিয়ানমার সরকারের রিপোর্টে অন্তত ১৫০ জন রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ নিহতের কথা বলা হয়েছে। এটাও যাচাই করা কঠিন।

প্রশ্ন: রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কি বলবেন; আপনি রোহিঙ্গা শব্দটি এড়িয়ে যাচ্ছেন।
উত্তর: আমি তাদেরকে রোহিঙ্গা বলবো যারা নিজেদেরকে এই শব্দে পরিচয় দিতে রাজি আছেন। আমি এক হাজারের মতো নিহত হয়েছে বলে একটি সংখ্যা জানতে পেরেছি। রাখাইন রাজ্যের পুরো উত্তরাঞ্চলে এরা নিহত হয়। শুধু কয়েকটি গ্রামে নয়।

প্রশ্ন: এক হাজারের বেশি নিহত হয়েছে?
উত্তর: আমি তা-ই বলবো। সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভিডিওতে স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে রাখাইন রাজ্যের ১০০ কি.মি. সীমান্ত জুড়ে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে মাত্র কয়েকজন মারা যাবে – এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। সরকার বলছে ৫০ থেকে ১০০ বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। তবে তারা বিদ্রোহী না বেসামরিক লোকজন তা আমরা জানি না। আমি গত অক্টোবর-নভেম্বরে হতাহতের সংখ্যার সঙ্গেও তুলনা করবো। তখনো এক হাজার বা এরকম সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছিল।

প্রশ্ন: এদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা কেমন?
উত্তর: আমরা জানার চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন: সম্প্রতি কফি আনান কমিশনের রিপোর্টে ‘সম্ভাব্য রেডিক্যালাইজেশনে’র আশংকা করা হয়েছে। এটি একটি নতুন ইস্যু। এই হুমকি কতটা বড়?
উত্তর:  রোডিক্যালাইজেশনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে রাখাইন রাজ্য। সেখানে মানুষ ২০১২ সাল থেকে যে অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে সেদিকে তাকান। চলাচলের কোন স্বাধীনতা নেই, মৌলিক চাহিদাগুলোতে প্রবেশ সুবিধা নেই। যুগ যুগ ধরে তারা বৈষম্যমূলক আইনের শিকার। তরুণ প্রজন্মের সামনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই পরিস্থিতিতে সীমারেখা পার হওয়া অতি সহজ।

প্রশ্ন: কমিশনের রিপোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো নাগরিকত্ব দেয়া। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে?
উত্তর: আমরা সবসময় জোর দিয়ে বলে আসছি যে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করতে হবে এবং যারা সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে তাদেরকে যত শিগগির সম্ভব নাগরিকত্ব দিতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য সেখানে অনেক পাইলট প্রকল্প রয়েছে। সরকার বলছে জনগণ সহযোগিতা করছে না। কিন্তু জনগণ এই প্রক্রিয়া নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, অত্যন্ত ধীর এই প্রক্রিয়া। সরকারের উচিত প্রক্রিয়া দ্রুততর করা।

প্রশ্ন: ২৫ আগস্টের সহিংসতা নিয়ে দুটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর একটি হলো আগের দিন (২৪ আগস্ট) প্রকাশিত আনান কমিশনের রিপোর্ট থেকে দৃষ্টি আড়াল  করতে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আরেকটি হলো, রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা পূর্বপরিকল্পিত। এমন বহু সংখ্যক ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া যায় যেগুলো থেকে বুঝা যায় যে সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। আপনি কি মনে করেন?
উত্তর: দু’টি ব্যাখ্যাই বেশ বিশ্বাসযোগ্য। আমি আগেও বলেছি যে মিয়ানমারে বিস্তারিত মাস্টার প্লান ছাড়া কোন কিছু ঘটে না।

প্রশ্ন: এই অভিযান শুরুর আগে খাদ্য, পানীয় এবং অন্যান্য সাহায্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়, এ কথা কি ঠিক?
উত্তর: ঠিক। সম্প্রতি সবকিছুই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ত্রাণ বিতরণ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মিডিয়া প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরপেক্ষ কোনো সংস্থা বা জাতিসংঘকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

প্রশ্ন: এই প্রথমবারের মতো আমরা খবরে দেখলাম যে হামলায় ১০ জন হিন্দু নিহত ও পাঁচশ’র মতো বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। জাতিগত ম্রো সম্প্রদায়ের মানুষও নিহত হয়েছে। এর মাধ্যমে কি সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা এখন আর মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই?
উত্তর: ম্রো জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্য নিহত হওয়ার কথা আমি জানি। সম্প্রতি আমরা হিন্দু পরিবারের কিছু ভিডিও ক্লিপ দেখেছি। এরা এখন কক্সবাজারে রয়েছে। তারা বলছে যে তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে।

প্রশ্ন: তাহলে আপনি কি বলবেন অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও সংঘাতে জাড়িয়ে পড়ছে?
উত্তর: আমি তেমনটা আশা করবো না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের অবস্থান প্রসঙ্গে, যদিও দেশটি সরকারিভাবে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ করতে দিতে অনিচ্ছুক, কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় আসলে তারা প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। এই মনোভাবকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
উত্তর: গত ২০-৩০ বছর ধরে বাংলাদেশ সহায়তা দিয়ে আসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব এসব মানুষকে তাড়িয়ে না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সাহায্য না করলে অনেক রোহিঙ্গা ধ্বংস হয়ে যেতো। রোহিঙ্গাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া তাদের বদান্যতার পরিচয়

প্রশ্ন: ভারত বলছে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাবে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। কিন্তু ভারতের এই অবস্থানকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর: আমাকে আরেক দেশের সরকার সম্পর্কে মন্তব্য করার কর্তৃত্ব দেয়া হয়নি।

প্রশ্ন: যেহেতু আমরা বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা করছি। তাই প্রসঙ্গক্রমে ভারতের কথাও এসেছে…
উত্তর: আমি বুঝতে পারছি। এখন মানুষ বাংলাদেশে যাচ্ছে, ভারতে যাচ্ছে না। তাই…

প্রশ্ন: গত মার্চে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের ব্যাপারে একটি বিবৃতি চীন ও রাশিয়া আটকে দেয়। ওই বিবৃতিতে মিয়ানমার সরকারের সমালোচনা করা হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। এখন এ নিয়ে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ ধরনের সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘ কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবে? শক্তিশালী দেশগুলো যদি কোনো উদ্যোগের পথে বাধা দিয়ে রাখে তাহলে জাতিসংঘ কতটা কার্যকর থাকবে?
উত্তর: নিরাপত্তা পরিষদের মার্চের অধিবেশনের ব্যাপারে বিস্তারিত আমার জানা নেই। তবে, কিছু দিন আগে নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আমি জানি এবং সেখান থেকে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি – এটা খুবই হতাশাজনক।

আজকালের খবর/এসএ









সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : সুমনা গণি ট্রেড সেন্টার, (৪ তলা) প্লট-২, পান্থপথ (সার্ক ফোয়ারা মোড়), ঢাকা।
ফোন : ০২-৫৫০১৩২১৪ ফ্যাক্স : ০২-৫৫০১৩২১৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৮৭৬৮৪৪২৪, সার্কুলেশন : ০১৭৮৯১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
Web : www.ajkalerkhoborbd.com, www.eajkalerkhobor.com