শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭
ধর্ষণ কি থামবে না?
সীমান্ত প্রধান
Published : Saturday, 12 August, 2017 at 6:10 PM

রাজশাহীতে ২২ মাসের শিশুকন্যা ধর্ষিত হয়েছে। এমন খবরে অবাক হবার কথা ছিল। অবাক হইনি। কেননা, গত বছর ৮ মাসের শিশুকন্যা ধর্ষণের সংবাদও আমরা পেয়েছিলাম। তাই ব্যাপারটা একটু ভিন্নভাবেই নিয়েছি। যে দেশে ৮ মাসের শিশু ধর্ষণ হতে পারে সে দেশে ২২ মাস বয়সী শিশুকন্যা ধর্ষণের খবর শুনে স্বাভাবিক অর্থেই বিচলিত হইনি।

আজকাল ধর্ষণ ঘটনার খবর শুনলে কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও হয় না। সব কিছু কেমন যেন গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। এইতো একবার পঞ্চাশোর্ধ্ব সাইফুল নামের একজন ৫ বছর বয়সী পুজাকে ধর্ষণ করলো। এর আগে এই লোকটা ওইটুকু বাচ্চা মেয়েটার যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে নিয়েছিল। কী নির্মমতা! ভাবা যায়? তনু, আফসানাকে তো ধর্ষণ করে মেরেই দিলো একদল জানোয়ার।

এইতো কদিন আগে খবর বের হলো সৎ বাবা আট বছর ধরে তার কন্যাকে ধর্ষণ করে আসছিল। এর আগে বনানীর ধর্ষণ ঘটনা নিয়েতো পুরো দেশজুড়েই হইচই । এর মধ্য দিয়ে গেল রোজাতে ছোট্ট একটি মেয়েকে ইফতারের দাওয়াত দিয়ে দাদুর বয়সী দুই পৌঢ় ধর্ষণ করলো। সম্প্রতি খবর পাওয়া গেছে ছয় মাস ধরে আটকে রেখে ভাতিজিকে ধর্ষণ করেছে তার চাচা।

এসব খবর দেখে, পড়ে মনে হচ্ছে দেশে ধর্ষণের মহোৎসব চলছে। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা খুললে এক বা একাধিক ধর্ষণ ঘটনার খবর পাচ্ছি। দেশে কী তবে ধর্ষণের মড়ক লেগেছে? এভাবে আর ভাবতে ইচ্ছে করে না। ধর্ষণ ঘটনা নিয়ে এখন আর কিছু বলতেও ইচ্ছে করে না। সব কিছু আমাদের গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত ইট-কাঠ-পাথরের শহরে থেকে আমরাও আমাদের মনটাকে পাথরের বানিয়ে ফেলছি। মেনে নিচ্ছি এসব অন্যায় অত্যাচার।

এই যে এত এত ধর্ষণ হচ্ছে, কোনোভাবেই এসব রোধ করা যাচ্ছে না। এর কারণ কী? এভাবে দিন দিন ধর্ষণের মতো ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েই যাবে! আমরা ভাববো। ভাবছি। কিন্তু এর প্রতিকার কীভাবে? ধষর্ণ ঘটনা বৃদ্ধির সম্ভাব কারণ কী?  একশজন ব্যক্তিকে যদি এই প্রশ্নটি করেন তবে সত্তর জনেরই উত্তর হবে বিচারহীনতার সৃংস্কৃতি। কেউ কেউ হয়তো ভিন্ন কিছু যৌক্তিক কারণ তুলে ধরবেন। কিন্তু অধিকাংশের মতামতটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম করাণ বলা যেতে পারে।

আমরা নিরাপত্তা দিতে পারছি না আমাদের নারীদের। সম্প্রতি বগুড়ার ধর্ষণ ঘটনাই বলে দিচ্ছে নারীদের নিরপত্তা দিতে আমরা কতটা ব্যর্থ। আর এসবের মূলে যে ক্ষমতা একটা বিশাল ফ্যাক্টর, ধর্ষণ পরবর্তী মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করার ঘটনাই তা প্রমাণ করে। আবার এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা যখন চলমান, তখন তিন বছরের এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করে মেরেই ফেলেছে এক জানোয়ার। এতটুকু ভীতি কাজ করছে না তাদের ভেতর। কতটা মানসিক বিকৃতি ঘটলে এমন জঘন্য কাজ করতে পারে একজন?

সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে ধর্ষণ ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা প্রতিটি মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনায় মানুষের ইমোশন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটছে। সমাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এসব নিয়ে রীতিমত ঝড় চলছে। তবে কেউ কেউ হয়তো তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন এই ভেবে যে পার্শ্ববর্তী ইন্ডিয়ার চেয়ে ভালো অবস্থানে আছি আমরা। আদতে কী তাই! এমন যারা বলেন তারা কী সে দেশের জনসংখ্যা আর আমাদের সংখ্যা তুলনা করে দেখেছেন?

সংবাদপত্রে যেসব ধর্ষণ ঘটনার সংবাদ পেয়ে থাকি তাই হিসাবে ধরে নিই। আদতে প্রকৃত ধর্ষণ সংখ্যা এর থেকেও অনেক বেশি। কেননা, অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা চেপে যাওয়ার প্রবণতা অনেকের মাঝেই বিদ্যমান। এর মূলে ন্যায় বিচার পাওয়ার পরিবর্তে সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় অনেককেই। এর ফলে অনেকেই থানা পুলিশ আইন আদালতের দ্বারস্থ হন না। এর অর্থ হচ্ছে ন্যায় বিচারের ঘাটতি রয়েছে। আর এটাকেই বলা যেতে পারে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

অথচ ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য ঘটনা প্রতিরোধে পার্শ¦বর্তী ভারতের থেকেও আমাদের দেশের আইন অনেক বেশি শক্তিশালী এবং যথার্থ। তারপরও ধর্ষণ ঘটনা কোনো ভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। একই আইনের ৯(২) ধারায় আছে, ধর্ষণ বা ধর্ষণপরবর্তী অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদÐ বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে। একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং উক্ত ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মত্যুদণ্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে।

এখানে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ এ যে শাস্তির কথা বলা হয়েছে তা নারী নির্যাতন রোধে যথেষ্ট বলেই মনি করি। এরপরও কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো ঘটনা এমনকি ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাÐও ঘটছে অহরহ। এসব ঘটনায় শিশু থেকে বৃদ্ধারাও বাদ যাচ্ছে না। দিন দিন যেন জঘন্য এ ঘটনাটি জ্যামেতিক হারেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্রও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। যার কারণে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। এ সুযোগে একশ্রেণি বেপরোয়াভাবে ধর্ষণকাÐ ঘটিয়েই যাচ্ছে।  

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং অপরাধীরা যথাযথ শাস্তি না পাওয়ায় অন্যরাও অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে যেতে উৎসাহ বোধ করছে। এখানে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধুতাকেও এড়িয়ে যাওয়া সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজ স্বার্থ রক্ষায় অপরাধীদেরও পক্ষাবলম্বন করে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি করে থাকে। এর পাশাপাশি নির্যাতিত পরিবার ও সামগ্রিক মানুষের সচেতনতারও অভাব রয়েছে এখানে। এসব কারণে ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামিই খালাস পেয়ে যায়।

এছাড়াও ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা-নীরিক্ষার কারণেও অনেক সময় ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী প্রমাণ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ কেইসের বেলায় চিকিৎসকরা শুধুমাত্র ধর্ষিতার মেডিক্যাল টেস্ট (রেপ ভিকটিম এক্সজামিন) করেন। এ পরীক্ষায় অভিযোগকারীর ইন্টারকোর্স (যৌন সম্পর্ক) হয়েছে কিনা তা উল্লেখ করা হয়। জোরপূর্বক (ফোর্স ফুল) আলামত পেলে তাও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কার দ্বারা কিংবা কতজনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক হয়েছে সেটি এ পরীক্ষায় অনুপস্থিত থেকে যায়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদের মতে, ভিকটিমের এ পরীক্ষার মাধ্যমে ধর্ষক কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়ে উঠে না। ধর্ষককে চিহ্নিত করতে হলে, অভিযোগকারী নারীর শরীরের কিংবা পোশাক ও বিছানার আলামত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এর পরে অভিযুক্ত ব্যক্তির ডিঅক্সিবাইবো নিউক্লিয়িক এসিড (ডিএনএ) টেস্ট করাতে হবে। একমাত্র ডিএনএন টেস্টের মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব।

তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এক পক্ষ ধর্ষণের শিকার হয়ে বছরের পর বছর ঘুরেও ন্যায়বিচার পাচ্ছে না আবার অনেকেই ধর্ষণের মিথ্যে অভিযোগ মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর হয়রানি হয়ে যাচ্ছেন। আমরা জানি ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করার জন্য কেউ কেউ ধর্ষণ মামলার আশ্রয় নিয়ে থাকে। যা মিথ্যা মামলা। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় যৌনপীড়ন এবং ৯ (৪) খ ধর্ষণের চেষ্টা করা, এই দু’টি ধারায় আদালত কিংবা থানায় অভিযোগ আনতে কোনো ধরনের চিকিৎসক সনদ কিংবা আলামতের প্রয়োজন হয় না। এ কারণে অনেকেই প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এ দু’টি ধারার অপব্যবহার করে থাকে।

এ ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্ত করার পরেও অনেক সময় ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়ে উঠে না। যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১৭ ধারা মোতাবেক, এ ধরনের মিথ্যা মামলা কিংবা অভিযোগ দায়ের শাস্তি ৭ বছরের সশ্রম কারাদÐ। তবে এ ধারার প্রয়োগটি চোখে পড়ার মত নয়। তাই এসব মামলার প্রয়োজনীয় তদন্তের প্রক্রিয়া আরও আধুনিক করতে হবে। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে যথাযথ সত্য মেডিক্যাল পরীক্ষা এবং একইসাথে অভিযুক্তের ডিএনএ টেস্টও করা জরুরী। এতে করে এ ধারার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে এবং ধর্ষণের ব্যাপারটিও সুরাহা হবে।

তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা-ভাবনার সার্বিক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বেশি সজাগ দৃষ্টি এবং ধর্ষণ মামলা ক্ষেত্রে কোনো ধরণের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা সম্পন্ন হতে হবে। তা না হলে পক্ষে বা বিপক্ষ যাই হোক না কেন ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবে মানুষ। সুষ্ঠু সুন্দর সমাজ বির্ণিমানে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধ করতে হলে এসব বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া খুবই জরুরী। একইসাথে ধর্ষণ ঘটনার সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সেই সাথে কেউ যদি মিথ্যে মামলার আশ্রয় নেয় তবে ১৭ ধারা মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করাও বাঞ্ছনীয়। এ জন্য রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে সর্বাগ্রে।

সীমান্ত প্রধান: কবি ও সাংবাদিক
simantaprodhan05@gmail.com



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : আজিজ ভবন (৫ম তলা), ৯৩ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০।
ফোন : +৮৮-০২-৪৭১১৯৫০৬-৮। বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭৮৭-৬৮৪৪২৪, ০১৭৯৫৫৫৬৬১৪, সার্কুলেশন : +৮৮০১৭৮৯-১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com