বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭
ঈদ টার্গেটে চড়ছে বাজার
শেখ মাহমুদ এ রিয়াত
Published : Friday, 11 August, 2017 at 10:16 PM, Update: 11.08.2017 10:27:50 PM

চালের দাম নিয়ন্ত্রণে না আসতেই নিত্যপণ্যের বাজার চড়তে শুরু করেছে। প্রতিবারের মতো এবারও পবিত্র ঈদুল আজহার টার্গেটে তৎপর হয়ে উঠেছে মুনাফালোভী সিন্ডেকেট। অতিবৃষ্টি, জলবদ্ধতা ও বন্যা সৃষ্টি করেছে অজুহাত। 

তুলনামূলক বাজারচিত্রে দেখা গেছে, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা, যা গতকাল বিক্রি হয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। একই সময়ে কেজি প্রতি আদার দাম ছিল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা, গতকাল বাজারে বিক্রি হয়েছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। রসুনও কেজি প্রতি ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে গতকাল। 

অথচ দেশের বাজারে এ তিনটি পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। মসলার বাজারেও উত্তাপ। এরইমধ্যে জিরা, এলাচসহ বেশ কিছু মসলার দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারদের থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয় বলেই তাদের বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়। কোরবানির ঈদের আর অল্প কয়েকদিন বাকি। ঈদ উপলক্ষে রাজধানীবাসী নিত্যপণ্য কেনাকাটা শুরু করেছেন। তবে বাজারে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, লবণ কেজিতে কয়েক টাকা বেড়ে প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সয়াবিন তেল লিটারে বেড়েছে দুই থেকে তিন টাকা। চালের দামও কেজি প্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। 

দেশের চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মসলার জোগান আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। কিন্তু বন্যাসহ নানা অজুহাতে সেখানে বুকিং রেট বাড়িয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশেও দাম বাড়ছে বলে দাবি পাইকারি ব্যবসায়ীদের। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস জানায়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী স্থল বন্দরের পাশাপাশি এবার চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েও মসলার ব্যাপক আমদানি হয়েছে। দেশে প্রতি বছর ২৮ থেকে ৩০ লাখ টন পেঁয়াজ, সাত থেকে আট লাখ টন আদা এবং নয় থেকে ১০ লাখ টন রসুনের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে চীন থেকে কিছু পরিমাণে আদা এবং রসুন আসলেও পেঁয়াজের বাজার পুরোপুরি ভারতনির্ভর।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে এক মাসে পণ্যটির দাম ৯৪ শতাংশ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা আগের মতোই বলছেন, ভারতে দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বাজারে প্রভাব পড়েছে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা আলতাফ হোসেন আজকালের খবরকে বলেন, পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আমরা পাইকারি বাজারে যে রেট পাই, সেই রেটের থেকে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা লাভে বিক্রি করি। শুনেছি, ভারতে বন্যার কারণে দাম বাড়ছে। তাই আমাদের দেশেও বাড়ছে। কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে পাঁচ কেজির এক পাল্লা পেঁয়াজ ২৭৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৫৫ টাকা। দুই সপ্তাহ আগেও তা বিক্রি হয়েছে ২৫ টাকায়।

সরবরাহে কোনো ঘাটতি আছে কিনা জানতে চাইলে পাইকারি বিক্রেতা মমিন হাওলাদার বলেন, দেশি পেঁয়াজের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু ভারতে বন্যা থাকার কারণে পেঁয়াজ একটু কম আসছে। মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি বন্যা এবং আড়তদারদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, ভারতে বন্যায় পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ায় দাম বেড়ে গেছে। আর দেশি পেঁয়াজের দাম আড়তদাররা যেভাবে ঠিক করছেন, সেভাবেই বাড়ছে। এছাড়া আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ গত সপ্তাহে ১২ টাকা বৃদ্ধির পর গতকাল শুক্রবারের বাজারে আবারও ১৫ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ গত সপ্তাহে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা দরে। ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা পশ্চিমবঙ্গে পেঁয়াজের দাম বাড়ার ব্যাখ্যা দিয়েছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ পেঁয়াজের দামের ওপর এ রাজ্যের অতিবৃষ্টির প্রভাব সাধারণভাবে পড়ার কথা নয়। কেননা তা আসে মূলত কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও নাসিক থেকে। কিন্তু বিপত্তি ভিন্ন রাজ্যেও। কর্নাটক, অন্ধ্রে বৃষ্টি না হওয়ায় পেঁয়াজের আকার বাড়েনি। শুকনো আবহাওয়ায় সেখানকার বেশিরভাগ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। আবার গুজরাট, মধ্যপ্রদেশে অতিবৃষ্টির ফলে নষ্ট হয়েছে পেঁয়াজ। ফলে পেঁয়াজ সরবরাহে একমাত্র ভরসা নাসিক। মহারাষ্ট্রের আকোলা থেকেও অবশ্য কিছু পেঁয়াজ আসছে রাজ্যটিতে। কিন্তু তাতে দাম বৃদ্ধি ঠেকানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে রাজধানীর মসলার পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদে চাহিদার তুঙ্গে থাকে জিরা, এলাচ ও দারুচিনি। এরইমধ্যে এসব মসলার দাম বেশ বেড়েছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতিকেজি জিরা ৩০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৫৫ থেকে ৩৯০ টাকায়, দারুচিনি ১০ থেকে ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকা থেকে ২৭০ টাকা ও এলাচ কেজিতে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩৫০ টাকা থেকে ১৬৮০ টাকায়। এছাড়াও তেজপাতা ৯০ টাকা থেকে ১৩০ টাকায়, সাদা গোল মরিচ ৯৮০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা, কালো গোল মরিচ ৬৮০ টাকা থেকে ৭০০ টাকায়, জয়ফল ৬৫০ টাকা থেকে ৯৫০ টাকায়, যত্রিক ১৩৫০ টাকা থেকে ১৪৫০ টাকা, কিসমিস ২৬৫ টাকা থেকে ২৭৫ টাকা, আলু বোখারা ৪৬০ টাকা থেকে ৪৯০ টাকা, কাঠবাদাম ৬১০ টাকা থেকে ৭১০ টাকা, পোস্তাদানা ৭৮০ টাকা থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শান্তিনগর বাজারের মসলা বিক্রতা হেলাল আজকালের খবরকে বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে বেশকিছু মসলার দাম বেড়েছে। ঈদের আগে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ দাম বেড়েছে। এদিকে পাইকারি বাজারের মসলার দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতিকেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, দারুচিনি ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা ও এলাচ বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ টাকা থেকে ১৭০০ টাকায়, তেজপাতা ১৫০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা, সাদা গোল মরিচ ১০০০ টাকা, কালো গোল মরিচ ৮০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকায়।

শান্তিনগর বাজারে মসলা কিনতে আসা আফরোজা বেগম আজকালের খবরকে বলেন, চালের পর পেঁয়াজ আদা, জিরা, এলাচ সব কিছুরই দাম বেড়েছে। ঈদকে পুঁজি করে বাড়তি মুনাফা করেন ব্যবসায়ীরা। ঈদের বাকি আরও কতদিন, কিন্তু এখনই দাম বাড়িয়েছে। ওদের (ব্যবসায়ীদের) তো কোনো সমস্যা নেই। টাকা যায় আমাদের। তিনি বলেন, বাজার তদারকিতে আরও কড়াকড়ি হলে উৎসব মৌসুমে পণ্যের দাম লাগাম ছাড়া হতে পারত না।

অন্যদিকে রাজধানীর কাঁচাবাজারে বেড়েছে সব ধরনের সবজি ও মাছের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দাম কেজি প্রতি বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। বাজারে ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। শত টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে শিম, টমেটো ও কাঁচামরিচের কেজি। একই অবস্থা মাছের দামেও। বেশিরভাগ সবজি ৫০ থেকে ৬০ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। বেগুন ৬০ থেকে ৭০ টাকা, প্রতি কেজি সাদা আলু ২৪-২৬ টাকা, ছোট ফুলকপি ২০-২৫ টাকা, করলার ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ৬০-৭০ টাকা, ২০ টাকা বেড়ে শিম ১১০-১২০ টাকা, টমেটো ১৩০-১৪০ টাকা, মূলা ৬০ টাকা, শসা ও খিরা ৫০-৬০ টাকা, ঢেঁড়স, ধুন্দল, ঝিঙা কাঁকরোল, চিচিঙ্গা ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়, পেঁপে ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ২৫-৩০ টাকা, বরবটি ৭০ টাকা, কুমড়া ৫০ টাকা, কচুরলতি ৫০ টাকা, কাঁচা কলা প্রতি হালি ৩০-৩৬ টাকা এবং লেবু প্রতি হালি ২০-২৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া কাঁচা মরিচের কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ১২০-১৩০ টাকায়। সবজি বিক্রেতা কামাল বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কম। এ ছাড়াও বন্যায় কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে। আর বর্ষা মৌসুমে সবজি কম পাওয়া যায়। এসব কারণে সবজির দাম বেড়েছে। 

সবজির সঙ্গে মিল রেখে বেড়েছে মাছের দামও। বাজারে প্রতি কেজি রুই, কাতলা ৩০০-৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ১৮০-২৫০, সিলভার কার্প ১৮০-২০০ টাকা, আইড় ৪৫০-৬০০ টাকা, মেনি মাছ ৩৫০-৪০০, বাইলা মাছ প্রকারভেদে ২৫০-৪০০ টাকা, বাইম মাছ ৪০০-৫০০ টাকা, গলদা চিংড়ি ৬০০-৮০০ টাকা, পুঁটি ২০০-৩৫০ টাকা, পোয়া ৪০০-৪৫০ টাকা, মলা ৩২০-৩০০ টাকা, পাবদা ৫০০-৬০০ টাকা, বোয়াল ৪৫০-৫০০ টাকা, শিং ৪০০-৭০০, দেশি মাগুর ৪০০-৭০০ টাকা, শোল মাছ ৪০০-৭০০ টাকা, পাঙ্গাস ১৬০-২০০ টাকা, চাষের কই ২০০-২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ মাছ প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়।

আজকালের খবর/এসএ



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : সুমনা গণি ট্রেড সেন্টার, (৪ তলা) প্লট-২, পান্থপথ (সার্ক ফোয়ারা মোড়), ঢাকা।
ফোন : ০২-৫৫০১৩২১৪ ফ্যাক্স : ০২-৫৫০১৩২১৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৮৭৬৮৪৪২৪, সার্কুলেশন : ০১৭৮৯১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
Web : www.ajkalerkhoborbd.com, www.eajkalerkhobor.com