বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৭
গল্পের গল্প
নিদেল শরিফ
Published : Thursday, 10 August, 2017 at 6:58 PM

এরি মধ্যে দু’একটা গল্প পত্রিকায় ছাপা হলো। আরে হ্যাঁ, জাতীয় পত্রিকায়। এই যে আপনি যেমন লেখকের নামটার দিকে আরেকবার তাকালেন, গল্পগুলো প্রকাশ হওয়ার পর আমিও অমন করে নিজের নামটা দেখে নিতাম বার বার। তখন নিজেকে হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল ভাবতে খুব ভালো লাগতো। রবীন্দ্রনাথও যে কয়েকবার ভাবিনি এমনটা অস্বীকার করব না। কিন্তু সে ভাবনা বেশিদূর এগোয়নি। একটা মেয়ের বইপ্রেম আর পুরুষ প্রেমিক; কাকে বেশি ভালোবাসে- এ নিয়ে তুমুল এক গল্প লিখেছিলাম। মেয়েটির মানসিক অবস্থার সেকি বর্ণনা ছিল গল্পে! আরো একটা গল্প লিখেছিলাম; একজন বেকার ব্যাচেলরের নানা টানাপড়েন নিয়ে। জীবনের ঘাত প্রতিঘাত নিয়ে সেকি মুল্যয়ন! আমার ধারণা আমি মানুষের সাইকোলজি বুঝি। তাইতো পরপর আরো কয়েকটি গল্প লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম সম্পাদকের ইমেইল অ্যাড্রেসে। না, আমি ভুল জানতাম। আপনি যেমন লেখকের নামটার দিকে আরেকবার তাকাননি, তেমনি সম্পাদকেরাও আমার গল্প আর ছাপেন নি। যেদিন পত্রিকাগুলোর সাহিত্যপাতা বের হতো-তন্ন তন্ন করে ‘খোঁজ দ্য সার্চ’ করতাম নিজের নামটা। অবশেষে হতাশ হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতাম চৌদ্দগুষ্টি  উদ্ধার করে।               

ফেসবুকের কথা যখন এলোই তখন এর দুয়েকটা গুণগান না করলে হাত নিসপিস করছে।  ওই যে গল্পগুলো প্রকাশ হয়েছিল, সেগুলো ফেসবুকে শেয়ার করবো না- এতটা গর্দভ আমি নই। এই যুগ নাকি প্রচারের যুগ। তো শেয়ারের পর ‘টু পাইস’ কামানোর মতো শ খানেক  লাইক আমারো জুটেছিল। আরো কিছু লাইক যে পেতাম না তেমনটা নয়, নেহাত বন্ধুসংখ্যা কম বলে এ নিয়েই আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। অনেক বন্ধু আবার কমেন্টও করেছে-নাইচ, ভালো হয়েছে। চালিয়ে যা মামা। কেউ কেউ গল্পের নায়িকাটির প্রেমে, কেউবা ছেলেটির, কয়েকজন আগবাড়িয়ে লেখকের প্রেমেও পড়েছে। সে প্রেম লেখককে একটু বিড়ম্বনায়ও ফেলেছে বৈকি! কিন্তু কয়েকজন সমঝদারও ছিল, যারা গল্পের ত্রুটি বের করে প্রমাণ করেছে-সাহিত্য বিচারে আমার গল্পগুলো কতটা আবর্জনা। মার্কস, নিটসে, ফ্রয়েড, কাফকা, চমস্কি, মার্কেজ থকে শুরু করে মানিকের রেফারেন্স দিয়ে তারা দেখিয়েছে, আমার গল্পের গরু গাছে চড়েছে। তারপরেও আমি লিখেছি ছাপা অক্ষরে নিজের নামটা দেখবো বলে।    
                 
লেখা ছাপা না হওয়ায় দিন দিন হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার লেখক হওয়ার সেকি প্রাণপণ অপচেষ্টা! এতদিন যে বন্ধুরা লেখক বলে পরিচয় করিয়ে দিতো, সে পরিচয়ে পড়লো ভাটা। মধ্যরাতে আমার অপ্রকাশিত গল্পের চরিত্রগুলো এসে ভিড় করতো মাথার ভেতর। স্বপ্নের ঘোরে দেখতাম তাদের অবাধ বিচরণ। ছাপা না হওয়া গল্পেরা এসে মাথার মধ্যে যেন জ্যাম হয়ে যেত। একটা গল্প লিখেছিলাম ইঁদুর নিয়ে। না না, আমি সোমেন চন্দের ‘ইঁদুর’ গল্প পড়ে এ গল্প লিখিনি। এ ইঁদুর ডিজিটাল ইঁদুর। এই ইঁদুরের কল্যাণে কতজন কত কী দেখে-সে গল্পটাই আমি বলতে চেয়েছিলাম। গল্পটা প্রকাশ না পাওয়ায় ক্লিক ক্লিক শব্দে ইঁদুররা আমার মাথায় এসে আঘাত করতো। তারপর ইঁদুরকে শান্ত করতে লিখলাম বিড়ালের গল্প। এ বিড়ালও বঙ্কিমের প্রবন্ধের বা রুদ্রের কবিতার ‘বিড়াল’ ছিল না। এ এক আধুনিক বিড়ালের গল্প, যে ঠিকমতো কাঁটা খেতে পারতো না। এখনতো আবার ড্যাম স্মার্ট, ‘লিটনের ফ্ল্যাটে’ যাওয়া ছেলেমেয়েরা বিড়ালের আদুরে ইংরেজি নাম রেখেছে। সে যাহোক, চরিত্রের দোষে বা লেখকের অদক্ষতায়, সে গল্পটিও সম্পাদক ছাপলেন না। প্রতিটা উৎসবে এ গল্প যেন আর্তচিৎকার করে আমায় তার অবস্থান জানান দিতো। তারপর সাপ, বেঁজি ও ময়ূর নিয়ে লিখলাম আরো তিনটা গল্প। শুক্রবার এলে আমি সকালবেলা পত্রিকাওয়ালার জন্য অপেক্ষা করি। দিনযতো গেছে সে অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে; গল্প আর ছাপা হয়নি। কয়েক সপ্তাহ যাওয়ার পর বুঝে যায়- যা হওয়ার হয়ে গেছে। তবুও তিন মাস অপেক্ষা করার নিয়ম মেনে লেখা আবার এডিট করে রেখে দিই ল্যাপটপে।    
               
এভাবে প্রতি তিনমাস যায়, বছর যায়, উৎসব যায় আমার লেখা আর ছাপা হয় না। এদিকে লোকজন জানতে চায়-কিরে, এখন কি লিখিস-টিখিস না নাকি? আমি ভাব নিয়ে জবাব দিই-আরে এত সময় কই অপচয় করার; ফালতু সময় নষ্ট! এদিকে আমি তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করি একটা লেখা যদি ছাপা হয়! ধৈর্যের বাঁধ যখন একদম ভেঙে যায় তখন কিছু একটা লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিই। প্রচারণা পেতে কার না ইচ্ছে করে!  লাইক, কমেন্ট পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রমাণ করে আমিও বাঙালির ছেলে। দিন কয়েক পর সে ফেসবুকের লেখাও নিচে পড়ে যায়। কত কত নতুন ইস্যু আসে, কিন্তু পত্রিকায় আমার গল্প আর আসে না। মাঝে মাঝে সম্পাদকদের ওপর রাগ হয়। দুনিয়ার হাবিজাবি এত গল্প ছাপাতে পারে, আমার বেলায় যতসব সাহিত্য! পরক্ষণেই নিজেকে সম্পাদকের আসনে বসিয়ে বাতিল করি নিজের সব গল্প। ভুলে যেতে চাই আমার অপ্রকাশিত গল্পের দুঃখগুলো। চাইলেই কী আর পারা যায়! অপ্রকাশিত দুঃখগুলো আবার ফিরে আসে দিগুণ হয়ে।         

চেষ্টায় অবহেলা আছে ভেবে মাঝে মাঝে আবার শুরু করি নতুনভাবে। এবার ইঁদুর, বেড়াল এসব প্রাণী বাদ দিয়ে লিখি জীবনের গল্প। গল্পে দেখাতে চেষ্টা করি একটা পাখির জীবন, একটা ফুলের জীবনের সাথে একটা মানুষের জীবনের পার্থক্য। বাংলা একাডেমির বানানের বই কিনি, ব্যাকরণের বই কিনি কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। অবশেষে এটা মানতে বাধ্য হই যে, আমার ভিতরে আসলে মালমসলা কিছু নেই। কিন্তু সাধারণেরও তো একটা ক্ষমতা থাকে, নিজের বলে কিছু থাকে-আমার কী কিছুই নেই! দুয়েকজন পরিচিত লেখকদের কাছে জানতে চাই-কীভাবে লিখলে লেখা ভালো হবে। ওনারা পরামর্শ দেন- পড়, প্রচুর পড়তে হয় লিখতে হলে। কেউ কেউ আবার মানিকের রেফারেন্স দেন-মানিক বলেছেন তিরিশের আগে না লিখতে; ওনি পড়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। সব শুনে আমি থমকে যাই। ওই যে আমার দুএকটা লেখা ছাপা হয়েছিল, তাহলে কেন ছাপা হয়েছিল সেগুলো! তাহলে কী আমার ‘রাইটার্স বøক’ চলছে। কবে শেষ হবে এই রাইটার্স বøক? কিন্তু না! আমার তো লেখা আসছে, শুধু লেখা মানসম্মত না বলে পত্রিকায় ছাপাচ্ছে না।       

গল্প বোধহয় আমাকে দিয়ে আর হবে না। যা লিখি তাতেই কিছু না কিছু সমস্যা থেকেই যায়। এবার আমি কবিতা নিয়ে উঠে পড়ে লাগি। কিন্তু মোহ মুক্তি হতে সময় লাগে না। কবিতার ছন্দ জিনিসটা যে এত কঠিন সে আমার ধারণারই বাইরে ছিল। কিন্তু অনেকে তো আধুনিক কবিতা বলে ইচ্ছে মত লিখছে! সে আধুনিক লেখা লিখতে গিয়েও বোঝা গেল- এ লেখারও কত মারপ্যাঁচ। নিতান্ত বাধ্য হয়ে ফিরতে হলো গল্পে।

এ লেখা লেখার সময়ও সেই ইঁদুরে গল্পটা, বিড়ালের গল্পটা মাথায় এসে ভিড় করে আছে। সাপ, ময়ূর এরাও মুক্তি চায় ল্যাপটপের সাজানো ফোল্ডার থেকে। গল্পগুলো চায় প্রকাশিত হতে। কিন্তু আমি অধম লেখকের সে ক্ষমতা নেই যে তাদের প্রকাশ করি। এরা আমার রাত্রি যাপনে অনিদ্রা হয়ে আসে; শিয়রে এসে বলে- আমায় মুক্তি দাও, দাও প্রকাশের শক্তি। আমি দুই কান চেপে ধরি; চেষ্টা করি তাদের দুঃখগুলো যেন আমাকে স্পর্শ না করে, কিন্তু পারি না। গল্পকারের মত গল্পেরও যে দুঃখ আছে সে অপ্রকাশিত গল্প মাত্রই জানে। মাঝে মাঝে নিজের জন্য মায়া হয়, সাথে অন্য লেখকদের জন্যেও। এতসব জরুরি কাজ ফেলে, দিনের পর দিন নষ্ট করে লেখা কত গল্পই না অপ্রকাশিত থেকে যায়! এ লেখাও যদি ইঁদুর-বিড়ালের  গল্পের মতো অপ্রকাশিত থেকে যায়, কে জানবে  এতো দুঃখ আছে অপ্রকাশিত গল্পের; কে জানবে গল্পেরও কত গল্প আছে!  


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : সুমনা গণি ট্রেড সেন্টার, (৪ তলা) প্লট-২, পান্থপথ (সার্ক ফোয়ারা মোড়), ঢাকা।
ফোন : ০২-৫৫০১৩২১৪ ফ্যাক্স : ০২-৫৫০১৩২১৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৮৭৬৮৪৪২৪, সার্কুলেশন : ০১৭৮৯১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhoborbd.com, www.eajkalerkhobor.com