সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭
আত্মার শুদ্ধতায় উত্তম বিনিয়োগ
রায়হান আহমেদ তপাদার
Published : Monday, 19 June, 2017 at 6:41 PM, Update: 19.06.2017 8:30:05 PM

কৃপণতা একটি মারাত্মক ব্যাধি যা ঈমান ও আমল উভয়কেই ধ্বংস করে দেয়। তাই অর্থ সম্পদ দান করাই কৃপণতা দোষ দূর করার উপায়। জাকাত মানে হচ্ছে পবিত্রতাকারী। অর্থাৎ জাকাত মুসলমানকে কৃপণতার মারাত্মক অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করে। এই পবিত্রতা ততটুকুই হবে যতটুকু মানুষ দান করবে এবং ব্যয় করে মানুষ আনন্দ অনুভব করবে।

সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে পবিত্র ইসলাম ধর্মে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জাকাতকে। পবিত্র ইসলাম ধর্মে রমজান মাসে সিয়াম বা রোজার সাধনাকে যেমন দেহের জাকাত বলা হয়েছে, তেমনি সঠিক নিয়মে জাকাত আদায়কে মানুষের উপার্জিত সব সম্পদের পবিত্রতাস্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মে এও বলা হয়েছে, রমজান মাসে যেকোনো ধরনের দান-সাদকা অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি নেকির সমান। রোজা পালনের পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা জাকাত ও ফিতরা দুটি আর্থিক ইবাদত করে আত্মতৃপ্তি তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করেন। তবে মনে রাখতে হবে, ধনী লোকের জাকাত-ফিতরা বা দান-সাদকা গরিব বা পীড়িত লোকের প্রতি কোনোরূপ করুণার বিষয় নয়; বরং আল্লাহ নির্দেশিত হক্কুল ইবাদত বা বান্দার হক। আরো সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে, জাকাত গরিবের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়, বরং তা গরিবের ন্যায্য অধিকার।

এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, শতকরা ৮৫ ভাগ মুসলমানের দেশে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চালু হলে পাঁচ বছরে দারিদ্র্য অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে বলা হয়েছে, দেশে পাঁচ লাখ পরিবার রয়েছে, যাদের নিজস্ব সম্পদ বলে কিছু নেই। আবার ২৭ লাখ পরিবার রয়েছে, যাদের মালিকানায় সম্পদের পরিমাণ এক একরের কম। পক্ষান্তরে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের কাছে ভোগদখলের উপজীব্য হয়ে আছে ৯৫ শতাংশ সম্পদ। দেশের মোট জমির ৮০ ভাগ এই শ্রেণির দখলে। আমরা জানি, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.) হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নির্দেশে প্রায় ১৫০০ বছর আগে জাকাতের অর্থ দিয়ে জনগণের মাঝে পানি সরবরাহের পাম্প স্থাপন করেছিলেন, যার সুবিধা এখনো ভোগ করছে মানুষ।

এবার আসুন, ধনীদের সম্পদ দানের কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। চীনের এক শীর্ষ ধনী তার সব সম্পত্তি একটি দাতব্য সংস্থাকে দান করে দিয়েছেন, যার মূল্য ১২০ কোটি ডলার। জানা গেছে,সমাজকল্যাণমূলক কাজে ৮৮ বছর বয়স্ক ইউ পেংনিয়ানের বিশাল অঙ্ক দানের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। পরপর পাঁচ বছর তিনি চীনের দাতাদের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছেন। উদারভাবে দান করার মতো মহানুভবতার কারণে তাকে আমেরিকার খ্যাতনামা দানবীর অ্যান্ড্রু কার্নেগির। অনুকরণে ‘চীনের কার্নেগি’ হিসেবে সম্মান করা হয়। পেংনিয়ান বলেছেন, এটাই আমার শেষ দান। কারণ দান করার মতো আমার কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই! তিনি আরো বলেছেন, সন্তানদের জন্য আমার অর্জিত সম্পদ রেখে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তারা যদি অযোগ্য হয়, তাহলে রেখে যাওয়া বিশাল অঙ্কের অর্থ কেবল তাদের ক্ষতিই করবে। কী অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি! আমাদের পুঁজিবাদী সমাজ কি এমন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করবে? আশার খবর হচ্ছে, ইসলামী দেশসমূহে জাকাত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মেরুদÐ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে জাকাত আদায়ের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডএম) এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশে ২৫ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় করে তা বণ্টন করা সম্ভব। বাংলাদেশ জাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা। এর আড়াই শতাংশ হারে জাকাতের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। সঠিকভাবে জাকাত আদায় করলে ১৫ বছরে দেশে জাকাত নেওয়ার মতো কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। জাকাত আদায়ের কয়েকটি খাত উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ফসলি জমির মালিক এক হাজার কোটি, গচ্ছিত স্বর্ণ অলঙ্কারে একশ’ কোটি, ব্যাংকিং খাতে ১ হাজার ২৪০ কোটি, শিল্পকারখানা থেকে এক হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র ও বন্ড থেকে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় করা সম্ভব। ‘মেকিং এ ডিফারেন্স উইথ জাকাত’ প্রতিপাদ্যে চতুর্থ জাকাত মেলার অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, বর্তমানে দেশে ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন কোটিপতি রয়েছেন যদিও এটা সঠিক হিসাব নয়।

অনেকে বলে থাকেন, দেশে ১০০ জন হাজার কোটি টাকার মালিক। এরা সবাই সঠিকভাবে জাকাত দিলে গরিব লোক থাকবে না। এর বাস্তবতার প্রমাণও আছে। হজরত ওমর (রা.)-এর সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনের কারণে ইয়েমেন প্রদেশে জাকাত গ্রহণের মতো লোক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। একইভাবে ওমর বিন আব্দুল আজিজের শাসনামলে মিসরেও জাকাত গ্রহণের মতো অভাবী লোকের সংখ্যা খুবই কম ছিল। সৌদি আবর, ইয়েমেন, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের কয়েকটি মুসলিম দেশে এখনো সরকারি ব্যবস্থাপনায় জাকাত আদায় ও বণ্টন করা হয়। বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও এ দেশে জাকাত আদায়-বণ্টন সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক নয়। বিত্তবানের সম্পদের শতকরা আড়াই টাকা হিসেবে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করতে হয়-এটাই জাকাত। জাকাত প্রদানে কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমজান মাসই জাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময় বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থার গুরুত্ব নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। দেশে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে অগণিত সফল ব্যবসায়ী, বিত্তবান, ধনাঢ্য শিল্পপতি রয়েছেন, যাদের কাছে কোটি কোটি টাকা এখানে-সেখানে গচ্ছিত অলস অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে থাকে। জাকাতের মতো বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিকটি আমাদের সরকার কখনো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেনি। আরো অভিযোগ আছে, ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাধীন সরকারের একটি অথর্ব প্রতিষ্ঠান ‘জাকাত বোর্ড’ নিয়ে। এই জাকাত বোর্ডের আসলে কাজ কী, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে জনমনে। কারণ দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত বোর্ডের ভূমিকা লক্ষ করা যায়নি। জাকাত বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতেও তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাদের নাম শোনা যায় বিশেষ করে ঈদের চাঁদ দেখা আর রোজার মাস শুরুর সময় এলে।

আমরা দেখছি-এনবিআর ধনীদের কাছ থেকে কর আদায়ে বহুমুখী কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কর প্রদানে রাষ্ট্রের উন্নয়নে সচেতনতা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে। জাকাত বোর্ড ও ইসলামী ফাউন্ডেশন কর আদায়ের মতো জাকাত আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। বাংলাদেশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বা মুসলিম দেশ। একটি মুসলিম দেশে ইসলামের বিধান অনুসারে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা থাকাটাই স্বাভাবিক। এখানে জাকাত আদায়ের লক্ষ্যে সক্ষম ধনীদের ওপর জরিপ পরিচালনা করে বিভাগ, জেলা ও থানাভিত্তিক জাকাত আদায় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে জাকাত নিয়ে যেন আবার জালিয়াতি না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিত্তবান মুসলমান ব্যক্তিপর্যায়ে জাকাত প্রদান করেন। তাদের অনেকে জাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্র-অভাবী আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে সাহায্য করেন। কেউ কেউ জাকাত হিসেবে শাড়ি-লুঙ্গি দিয়ে থাকেন। অনেকে জাকাতের অর্থ দিয়ে মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা লিল্লাহ বোর্ডিং পরিচালনা করেন।

ধনী লোকের জাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক। জাকাতে সম্পদের পরিশুদ্ধতা আসে- মানব জীবনাচরণে আত্মসংমের সৃষ্টি হয়। জাকাত দিতে হবে হিসাব মতো, বুঝে-শুনে। মনে রাখতে হবে জাকাত প্রদানের উদ্দেশ্য অভাবগ্রস্তের অভাব দূরীকরণ। জাকাত কখনই রিলিফের মতো ব্যানার প্রদর্শন বা মাইকিং করে দেওয়াও ঠিক নয়। জাকাত দেওয়া উচিত সম্মানের সঙ্গে। কারণ এটা জাকাত প্রার্থীর অধিকার আর জাকাত প্রদানকারীর কর্তব্য-যা মহান আল্লাহর নির্দেশনা। সবাইকে একটু সচেতন করলে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সরকারের উদ্যোগে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে জাকাতের অর্থ ব্যয় হলে দরিদ্র্য মানুষ সত্যিকারভাবেই স্বাবলম্বী হতে পারবে। অবাক লাগে, আমরা শাড়ি বা লুঙ্গি দিয়ে একজন গরিব মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর নামে তার ইচ্ছে, প্রয়োজন বা পছন্দকে কিভাবে তাচ্ছিল্য করছি! জাকাতের নগদ অর্থ দিলে বরং তারা প্রয়োজনে পছন্দমাফিক কাপড়-চোপড় ক্রয় করবে, কিংবা সংসার নির্বাহে ব্যয় করে সাময়িকভাবে অভাব দূর করতে পারবে।

কিন্তু জাকাত হিসেবে শাড়ি-লুঙ্গি অগ্রাধিকার পাওয়ার কারণে জাকাতপ্রার্থীরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেয়ে থাকে। ভাবনার বিষয়টি হলো-শাড়ি-লুঙ্গির চেয়ে তাদের সাংসারিক অনটন ও দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে উপযুক্ত হারে নগদ অর্থ দেওয়া হলে তা দিয়ে তারা সত্যিকারভাবে উপকৃত হতো। যদিও জাকাতে উদ্দেশ্য সাময়িক সমাধান নয়-স্থায়ীভাবে অভাবমোচনের উপায় করে দেওয়া। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষেরা যদি নিজ নিজ গ্রামের গরিব এবং অসামর্থ্য আত্মীয়-স্বজনকে দোকানপাট, কুটির শিল্প, নৌকা, ট্রলার, ভ্যানগাড়ি, মাছ ধরার জাল, রিকশা বা উপার্জনমুখী ব্যবস্থায় দান বা সহায়তা করেন, তাহলে সামাজিকভাবে, সর্বোপরি রাষ্ট্রের মাঝে ধনী-দরিদ্রের বিস্তর ব্যবধানে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। এভাবে সমাজের সব স্তরের মানুষ যদি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করে, তাহলে আমাদের সমাজ থেকে বস্তিবাসী, ছিন্নমূল, টোকাই, পথশিশু, ভিক্ষুক, হিজড়া-এসব নির্মম শব্দগুলো বিলুপ্ত হবে।

আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন আনতে পারি। এর জন্য শুধু ধনের নয়, মনের দারিদ্র্যও দূর করা দরকার। মানুষের সবচেয়ে কাম্য প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে বিসর্জন দিতে বলা হয়েছে। আর সেই বিসর্জন তিনিই অনায়াসে করতে পারেন যার ভালোবাসা মৌখিক কপটতায় পূর্ণ নয় বরং আত্মিক। সেই জন্যই মহান আল্লাহ বলেছেন “আল্লাহ মু’মিনদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করেছেন”। দ্বিতীয় কারণ হলো- মানুষকে কৃপণতা দোষ থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্য থাকাতেই জাকাত ওয়াজিব হয়েছে। আর তৃতীয় কারণ হলো-নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা।

রায়হান আহমেদ তপাদার: যুক্তরাজ্য প্রবাসী।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : সুমনা গণি ট্রেড সেন্টার, (৪ তলা) প্লট-২, পান্থপথ (সার্ক ফোয়ারা মোড়), ঢাকা।
ফোন : ০২-৫৫০১৩২১৪ ফ্যাক্স : ০২-৫৫০১৩২১৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৮৭৬৮৪৪২৪, সার্কুলেশন : ০১৭৮৯১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhoborbd.com, www.eajkalerkhobor.com