মঙ্গলবার, ২৭ জুন, ২০১৭
নির্বিঘ্ন যাত্রার নিশ্চয়তা আছে তো
অলোক আচার্য্য
Published : Monday, 19 June, 2017 at 6:40 PM

নির্বিঘ্ন যাত্রার নিশ্চয়তা আছে তোগতবছর রমজানের ঈদের ছুটি ছিল টানা নয়দিন। ছুটির শুরু থেকে অর্থাৎ এক থেকে বারো তারিখ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল ১৮৬ জন। আহত হয়েছিল ৭৪৬ জন। এই কয়েকদিনে তাহলে গড়ে পনের-ষোল জন করে মানুষ মারা গিয়েছিল। কোরবানির ঈদেও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গিয়েছিল।

ঈদের পরদিন সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে ষোল জন মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। আহত হয়েছিল ঊনসত্তুর জন। প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটায় বহু মানুষের প্রাণহানী ঘটাচ্ছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেওয়া ২০১৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য অনুযায়ী সে বছর ৮ হাজার ৬৪২ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল এবং আহত হয়েছিল ২১ হাজার ৮৫৫ জন। এছাড়া ২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৫৮৯ জন এবং আহত হয়েছিল ১৭ হাজার ৫২৬ জন।

আমাদের দেশে উৎসব ও আনন্দের অন্যতম বড় উপলক্ষ হলো দুটি ঈদ। এই দুই ঈদকে সামনে রেখেই রাজধানীতে বসবাসকারী চাকুরিজীবীরা নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নেয়। এছাড়া ছোটখাটো অনেক ছুটিই বছরে থাকে। কিন্তু সেসব ছোটখাট  ছুটিতে বাড়িতে বেড়ানোর সুযোগ থাকে কম আবার সুযোগ থাকলেও যাওয়া আসার ধকল সহ্য করে অফিস করাটা অনেকেই সহ্য করতে চান না। তাই নেহায়েত খুব দরকার না হলে এসব সময় যাওয়া হয়ে ওঠে না। মোট কথা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ গ্রামে যান না। ফলে পরিবারের বৃদ্ধ মা বাবা বা আতœীয় স্বজনকে দেখার ও তাদের সাথে প্রাণ খুলে কথা বলার সময় বা সুযোগ কোনোটাই সারাবছর হয়ে ওঠে না। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজও ফেলে রাখা হয় এ সময়ের জন্য। মনের জমিয়ে রাখা কথাগুলো সবসময় মোবাইল ফোনে বলা হয় না। কারণ ফোনে শুধু কথাই বলা যায় কাজ করতে হলে তো নিজে যেতে হয়। ফলে ঈদের ছুটিই একমাত্র ভরসা।

দেশের কর্মজীবী জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ রাজধানী ঢাকায় বসবাস করে। এর কারণও আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যারা অর্থনৈতিকভাবে অথবা অবস্থানগত সমস্যায় থাকে তারা ঢাকামুখী হয়। প্রতিদিন কাজের খোঁজে সুদূর পল্লী গাঁ থেকে এখানে এসে জড়ো হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই। কাজ করে নিজে বাঁচা, সাথে পরিবারটাকেও বাঁচানো। যদিও দেশের অন্যান্য বড় বড় শহরেও গ্রাম থেকে এসে মানুষ বসবাস করে। কিন্তু তাদের সংখ্যা ঢাকার তুলনায় সামান্যই বলা চলে। তাদের গন্তব্য থাকে গ্রামের বাড়িতে। এসব বসবাসকারী মানুষের একটা বড় অংশই আবার পরিবার পরিজনহীন হয়ে বাস করে। তাদের বাস করার জায়গা হলো  সাব লেট বা মেস। আবার পুরুষের পাশাপাশি নারীদের একটা বিশাল অংশ ঢাকায় কর্মরত। বিশেষ  করে পোশাক কারখানাগুলোতে এরা কর্মরত। এসব কারণে ঈদে একসাথে বাড়ি ফেরার তাড়া শুরু হয়। এর ফলে রাস্তার উপর চাপ বাড়ে। এই চাপের ফলে চিরেচ্যাপ্টা হয়ে প্রতি বছর বাড়ি ফিরতে হয়। তবে বাড়ি ফেরার সাথে সাথেই পথের ক্লান্তি, দুর্ভোগের কথা এক নিমেষই উড়ে যায়।

ঘুরে ফিরে প্রতিবার একটি প্রশ্নই সামনে চলে আসে। তা হলো জনদুর্ভোগ এবং দুর্ঘটনা। প্রতি বছর এসময় বাড়ি ফেরার সময় যে অবর্ণনীয় দুর্র্ভোগ পোহাতে হয় তা তো আমরা জানি। দেশে ভর্তির জন্য ছাত্রছাত্রীদের যুদ্ধ করতে হয়, আবার টিকিট পেতেও যুদ্ধ করতে হয়। এই দুর্ভোগ শুরু হয় টিকিট বিক্রির শুরুর দিন থেকেই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে কেউ টিকিট পায় আবার কেউ টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরে। এসময় যাত্রীদের অভিযোগও থাকে বিস্তর। টিকিট কালো বাজারিদের হাতে চলে যাওয়ার খবরও আমরা পেয়ে থাকি। তবে এ বছর দেখছি চিত্র খানিকটা স্বস্তিদায়ক। অর্থ্যাৎ অভিযোগের মাত্রা কম। তবে দুর্ভোগ আছে। এই দুর্ভোগের শেষ হয় বাড়ি পৌঁছানোর পর। আতœীয় স্বজনদের মুখ দেখার পর। এ বছর সরকারি ছুটি একটু বেশি পেয়ে সবাই খুব আনন্দিত। নয়দিনের এই টানা ছুটিতে নানা জনের নানা কাজ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সবাইকে নিয়ে নির্মল আনন্দে মেতে ওঠাটাই সবথেকে বড় কাজ।

লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। বিশাল সংখ্যক মানুষের যাত্রা যেন ফিরে আসা  পর্যন্ত আনন্দেরই থাকে এটাই আমরা আশা করি। ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সংখ্যাটা বিশাল সন্দেহ নেই। আর আমাদের যে সামর্থ্যর খুব পর্যাপ্ত তাও জোর দিয়ে বলতে পারি না তবে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রæটি চোখে পরে না। বাস, ট্রেন বা নৌ পথের সার্ভিস নিরাপদ করার নানামুখী উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ঈদে বাড়ি ফেরার সবচেয়ে বড় ভোগান্তির নাম যানজট। ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। সামনে এগোনোর পথ থাকে না। এই জট শুরু হয়েছে ঈদ যাত্রা শুরুর আগে থেকেই। এখনই ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে চলচলে দ্বিগুণ সময় লাগছে। যানযটের কারণ চিহ্নিত করলে দেখা যায়, যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার জন্য এলোমেলোভাবে গাড়ি থামানো, কিছু মহাসড়কের উপর বাসষ্ট্যান্ড, যেকোনো সময় ফিটনেসবিহীন গাড়ি বিকল হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, চৌকস ড্রাইভারের অভাব, নিয়ম না মেনে গাড়ি চালানো, নিয়ম না মেনে আগে যাওয়ার প্রবণতা। গত বছরও অনেক মানুষ এ সময় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল। যেসব পরিবারের সদস্যরা মারা গিয়েছিল ঈদের আনন্দের পরিবর্তে সেখানে ছিল শুধুই চোখের জল। কারণ প্রিয়জন হারানোর কি যন্ত্রণা সে যার যায় সেই বোঝে। ঈদ ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। আর ঈদে যেহেতু সড়কের ওপর বাড়তি চাপ থাকে সেহেতু দুর্ঘটনার শঙ্কাও বেশি থাকে। কিন্তু আমরা চাই না কোনো সময়ই সড়ক দুর্ঘটনায় একটি প্রাণও অকালে ঝরে যাক। আর শুধু মারা যাওয়ার কথা বলছি কেন। যারা আহত হয় সেসব ক্ষতও তো  অনেক মারাত্বক। অনেক আহতদের এমনভাবে বেঁচে থাকতে হয় যা মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সারাজীবন জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে কাটাতে হয়। তাছাড়া মারা গেলে বা আহত হলে পরিবারগুলোও আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পরে।

ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ যেমন বেড়ে যায় তেমনি হঠাৎ করেই রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যাও বেড়ে যায়। এর একটা কারণ হলো গ্যারাজে পরে থাকা ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোকে ফিটনেস পরীক্ষা না করেই যাত্রী বহনের জন্য রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তাতে হাতে এককালীন বেশকিছু টাকাও চলে আসে আর যাত্রীর তো অভাবই নেই। বাড়ি ফেরার তাড়ায় এতো কিছু বিচার করার সময় তারা পায় না। এসব ফিটনেসবিহীন গাড়িকে এমনভাবে রং চং করা হয় যে বাইরে থেকে এসব গাড়িকে চেনাই যায় না যে মাত্র কয়েকদিন আগেই এগুলো চলাচলের অনুপযুক্ত ছিল। এসব গাড়ির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। ফলে কর্তৃপক্ষের উচিত ফিটনেসবিহীন গাড়ি যেন রাস্তায় নামতে না পারে। কারণ শুধু নিজের পকেট ভারী করতে গিয়ে অন্যের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অধিকার কারো নেই। এজন্য একটাই চাওয়া ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাওয়া এবং ফিরে আসা যেন নির্বিঘœ হয়।


অলোক আচার্য্য: কলামিস্ট।


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : সুমনা গণি ট্রেড সেন্টার, (৪ তলা) প্লট-২, পান্থপথ (সার্ক ফোয়ারা মোড়), ঢাকা।
ফোন : ০২-৫৫০১৩২১৪ ফ্যাক্স : ০২-৫৫০১৩২১৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৮৭৬৮৪৪২৪, সার্কুলেশন : ০১৭৮৯১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhoborbd.com, www.eajkalerkhobor.com