বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন, ২০১৭
নীরব থাকা, আর সরব হওয়া দুটোই রাজনৈতিক: অরুন্ধতী রায়
Published : Tuesday, 6 June, 2017 at 6:25 PM

নীরব থাকা, আর সরব হওয়া দুটোই রাজনৈতিক: অরুন্ধতী রায়

পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্যা মিনিস্ট্রি অব আমোস্ট হ্যাপিনেস্ট’ উপন্যাসের শেষের দিকে এর দুই প্রধান চরিত্রের একজন তিলোত্তমার একটি কবিতা রয়েছে: “স্বপ্নভঙ্গের গল্প বলবো কেমনে? ধীরে ধীরে সবার হয়ে ওঠা, না, ধীরে ধীরে সবকিছু হয়ে ওঠা।”

আসলে ১৯৯৭ সালে লেখা ‘গড অব স্মল থিংস’র পর তার দ্বিতীয় উপন্যাসে অরুন্ধতী (৫৫) যেন সহসাই সবকিছু হয়ে উঠছেন, হয়ে উঠলেন সবার। তিনি একদা আফতাব নামে পরিচিত দিল্লির সেই বিখ্যাত হিজরা আনজুম। রহস্যময় সে, কৃষ্ণবরণ তিলোত্তমা, যার জায়গা নেই কারো কাছে। তিনিই সেই বিপ্লবি হয়ে ওঠা কাশ্মিরি ছাত্র মুসা। তিনিই আবার গার্সন হোবার্ট, সবদিক দিয়ে একজন উচ্চবর্ণ-উঁচু জাতের নিপীড়ক। কিন্তু এরচেয়েও বেশি, অরুন্ধতী তার খেয়ালি দৃষ্টি দিয়েছেন ভারতবাসীর প্রতি, তাদেরকে ভাগ করেছেন। এটি এমন এক স্থান যেখানে “যুদ্ধ হলো শান্তি, আবার শান্তিই হলো যুদ্ধ”। আছে ইমার্জেন্সি, আছে গোধরা (গুজরাটের দাঙ্গা), ১৯৮৪ সালের শিখ বিরোধী দাঙ্গা, আছে অযোধ্যা - এগুলো কাশ্মির বা (ছত্তিশগড়ের) বাসতারের যুদ্ধ থেকে কম কিছু নয়। এমনই পটভূমিতে অরুন্ধতী বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষের গল্পগুলো একটি সুতোয় গেঁথেছেন, পরিবেশের সঙ্গে তারা কিভাবে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয় তা দেখিয়েছেন। এখানে আছে অযৌক্তিক আশা নিয়ে ব্যাকুলতা, আছে আঘাত ও বিশ্বাসঘাতকতার বেদনা। আমাদের সমাজের শ্রেণীবিভাগের মধ্যে যে সহজাত সহিংসতা লুকিয়ে আছে এই সাক্ষাতকারে অরুন্ধতী তা নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন আশার সৌন্দর্য নিয়ে, বলেছেন লেখাই তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহ। সাক্ষাৎকারটি সংক্ষিপ্তাকারে নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: প্রথম উপন্যাসের প্রায় ২০ বছর পর ‘দ্যা মিনিস্ট্রি অব আমোস্ট হ্যাপিনেস্ট’ প্রকাশিত হলো, উপন্যাসের প্রতি আপনি কি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন?
অরুন্ধতী রায়: কে বলেছে! এই ২০ বছরের ভাবনা, আমার কাজগুলো এতে স্থান পেয়েছে। আসলে এই উপন্যাস লেখার কাজ আমি ১০ বছর আগে শুরু করেছিলাম। এটা আমার ধারাবাহিক প্রচারণার অংশ ছিল। হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে অন্য কাজও আমি করেছি। আমি অনেক গবেষণার সঙ্গে জড়িত হয়েছি। কিন্তু উপন্যাস সবসময় আমার মাথায় ছিল।

প্রশ্ন: তাই বুঝি উপন্যাসের বেশিরভাগ অংশ ভারতের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে, বালজাক তো বলেই গেছেন, কোন জাতির গোপন ইতিহাসই আসলে উপন্যাস।
অরুন্ধতী: আসলে আমি কোন তাত্ত্বিক চিন্তা মাথায় রেখে উপন্যাস লেখার চিন্তা করিনি। কখনো তাৎক্ষণিক বা উপযোগবাদী কর্মও করতে চাইনি। আমার কাছে উপন্যাস প্রার্থনা বা গান গাওয়ার মতো– এগুলোকে ঠিক সংজ্ঞায়িত করা যায় না। সবকিছুর উর্ধ্বে আছে একটি গল্প।

প্রশ্ন: সর্বশেষ উপন্যাসে আপনি বলেছেন কিভাবে সহিংসতার স্মৃতি মানুষকে ভেঙ্গে পড়া থেকে রক্ষা করে। আপনি কি মনে করছেন যে এই সত্য-উত্তর বিশ্বে মানুষ ক্রমেই সহিংসতার ভয়াবহতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে?
অরুন্ধতী: আমরা যখন ভেঙ্গে পড়া নিয়ে কথা বলি, এই বইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি দেখানো হয়েছে তাহলো প্রায় সবার সামনেই একটি সীমারেখা রয়েছে। আনজুম, সে হিজরা; তিলো, সে নিম্ন জাত, সাদ্দাম হোসেন, সে ধর্মান্তরিত এবং জাত, আর মুসাকে বলা যায় জাতীয় সীমান্ত। এমনকি গারসন হোবার্ট শাসক মহলের ভাষায় কথা বললেও অনেক জায়গায় গিয়ে হোঁচট খায়। আমার মনে হয় কোনগুলোকে সহিংসতা বলে গণ্য করা হয়, আর কোনগুলো করা হয় না এটাই সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞা। বর্ণ সহিংসতা, ভারতীয় সমাজে মানুষকে যেভাকে অবনমিত করে রাখা হয় তা কি কাউকে আঘাত করা বা পেটানোর চেয়ে গুরুতর সহিংসতা নয়? আমি মনে করি, আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো আমরা এগুলো হজম করে ফেলছি। আমাদের উদরে এত বেশি সহিংসতা জমা হয়েছে যে আমাদের জন্য নৈতিক হওয়া কঠিন। সমস্যায় পরিপূর্ণ একটি সমাজে আমরা বাস করছি। কারণ, আমরা সহিংসতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছি। সহিংসতা বলতে আমি শুধু শারীরিক সহিংসতা বুঝাচ্ছি না। আমাদের সমাজের হায়ারার্কিতেও সহিংসতা আছে এবং আমরা সবাই তা মেনে নিয়েছি।

প্রশ্ন: সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে তুর্কি লেখিকা ইলিফ শাকাফ বলেছেন যেসব দেশে জাতিগত বিভক্তি রয়েছে সেখানকার লেখকরা রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার বিলাসিতা করতে পারে না। আপনি কি মনে করেন?
অরুন্ধতী: আপনি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করায় ভালো হয়েছে। কোন প্রেমের গল্প, কিংবা বলিউডের স্ক্রিপ্ট– কোথায় রাজনীতি নেই। তবে, কথা হলো আপনি কিভাবে রাজনীতিকে দেখতে চান। কোন কিছু উপেক্ষা করে চলা, আর কোন বিষয়ে সরব হওয়া - দুটোর মধ্যেই রাজনীতি রয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িত তাদের পক্ষে কথা বলে আপনি বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার করছেন।
অরুন্ধতী: যেই মুহূর্তে আপনি কথা বলা থামিয়ে দেয়া শুরু করবেন সেই মুহূর্ত থেকে কারো কথা শুনলে আপনার অস্বস্তি বোধ হবে। আপনার নিজের আইকিউ কমানো শুরু করা মানে আপনি যে সমাজে বাস করেন তার আইকিউ কমানো শুরু করা। তখন আপনি একটি চরম মূর্খ্য রাষ্ট্রে পরিণত হবেন। বাক স্বাধীনতা খর্ব করার দুটি উপায় আছে। একটি আইন দিয়ে, আনুষ্ঠানিকভাবে। আরেকটি সহিংসতা চালিয়ে, এমন পরিবেশ তৈরি করে যেখানে জনগণ নিজে থেকেই নিজেদেরকে সেন্সর করবে। যেভাবেই হোক না কেন এতে আপনি আপনার আইকিউ ক্ষতিগ্রস্ত করছেন।

প্রশ্ন: আপনি কাশ্মির, ভারতের পারমাণবিক সজ্জা, ছত্তিশগড়, নর্মাদা বাঁচাও আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন। এগুলো মধ্যে কোনটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ফেলেছে?
অরুন্ধতী: এগুলোর একটিকে আরেকটি থেকে বিচ্ছিন্ন বলে আমি মনে করি না। প্রতিটি ঘটনা সতর্কতার সঙ্গে বিচার করলে আপনি দেখতে পাবেন একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তবে, রাজনীতির ব্যাপারে আমার সবচেয়ে গভীর উপলদ্ধি তৈরি হয় নরমাদা উপত্যকার আন্দোলন করতে গিয়ে। এটা শুধু মানুষেরই সমস্যা নয়, সমস্যা ছিলো জীব প্রজাতির। যেখানে আমাদের চাতুর্য আমাদের টিকে থাকার সহজাত প্রবণতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল বলে মনে হয়েছে।

আজকালের খবর/এসএ
 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : সুমনা গণি ট্রেড সেন্টার, (৪ তলা) প্লট-২, পান্থপথ (সার্ক ফোয়ারা মোড়), ঢাকা।
ফোন : ০২-৫৫০১৩২১৪ ফ্যাক্স : ০২-৫৫০১৩২১৫, বিজ্ঞাপন : ০১৭৮৭৬৮৪৪২৪, সার্কুলেশন : ০১৭৮৯১১৮৮১২
ই-মেইল : newsajkalerkhobor@gmail.com, addajkalerkhobor@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhoborbd.com, www.eajkalerkhobor.com